মাহফুজুর রহমান
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
পুরান ঢাকার হৃদয়ে অবস্থিত চকবাজার শাহী মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি ঢাকার নগর ইতিহাস, মুঘল স্থাপত্য এবং সামাজিক বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মসজিদকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে ধর্মীয় আচার, শিক্ষা, ব্যবসা ও জনজীবনের নানা অধ্যায়। সময়ের প্রবাহে বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও চকবাজার শাহী মসজিদ আজও পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
চকবাজার শাহী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে, মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খানের শাসনামলে। সেই সময় ঢাকা ছিল বাংলার মুঘল সুবাহর রাজধানী এবং প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। চকবাজার এলাকা ছিল তৎকালীন ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনসমাগমস্থল। প্রশাসনিক কেন্দ্র, ব্যবসায়িক এলাকা ও আবাসিক অঞ্চলের সংযোগস্থলে এই মসজিদ নির্মাণের পেছনে ছিল ধর্মীয় প্রয়োজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব।
শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকায় একাধিক মসজিদ, মাদরাসা ও স্থাপত্য নির্মিত হয়। চকবাজার শাহী মসজিদ সেই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ফার্সি শিলালিপিতে মসজিদের নির্মাণকাল ও পৃষ্ঠপোষকের পরিচয় পাওয়া যায়, যা মুঘল আমলের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না; বরং শিক্ষাকেন্দ্র, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক সমাবেশের জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান শাহ বলেন, ‘চকবাজার শাহী মসজিদ পুরান ঢাকার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের নীরব সাক্ষী। যদিও সময়ের প্রয়োজনে এর কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে, তবু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমেনি। এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঢাকা হঠাৎ করে এমন আধুনিক শহর হয়নি, এই শহরে এক সময় সমৃদ্ধ সভ্যতা ছিল।’
স্থাপত্যের বিস্তারিত বর্ণনা
প্রাথমিকভাবে চকবাজার শাহী মসজিদ ছিল একটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট মুঘল মসজিদ। এটি একটি উঁচু পাথরের প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত ছিল, যা সে সময়কার মুঘল স্থাপত্যে তুলনামূলক বিরল বৈশিষ্ট্য। এই উঁচু প্ল্যাটফর্মের নিচে ভল্টেড কক্ষ বা ঘর ছিল, যেগুলো মাদরাসার ছাত্রদের আবাসন, পাঠদান কিংবা ধর্মীয় কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
মসজিদের মূল কাঠামো ছিল আয়তাকার। তিনটি গম্বুজের মধ্যে মাঝেরটি ছিল অপেক্ষাকৃত বড় এবং উঁচু, আর দুই পাশের গম্বুজ ছিল কিছুটা ছোট। দেওয়ালে ছিল চুন-সুরকির কাজ, খিলানযুক্ত দরজা ও মিহরাব। মিহরাবের অলঙ্করণ ছিল তুলনামূলক সংযত, যা মুঘল স্থাপত্যের ভারসাম্যপূর্ণ নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নামাজির সংখ্যা বাড়ার কারণে মসজিদে একাধিকবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। এতে মূল স্থাপত্যের অনেক বৈশিষ্ট্য আড়ালে চলে যায়। আধুনিক কংক্রিটের স্তম্ভ, নতুন ছাদ, অতিরিক্ত তলা এবং রঙিন মিনার যুক্ত হওয়ায় মসজিদটি আজ একটি বহুতল কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। যদিও এতে ধারণক্ষমতা বেড়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী মুঘল নকশার স্বচ্ছতা অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে স্থাপত্যবিদদের একাংশ মনে করেন।

সংস্কার ও বিতর্ক
চকবাজার শাহী মসজিদের ইতিহাসে সংস্কার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় মুসল্লি, ওয়াক্ফ প্রশাসন এবং দাতাদের উদ্যোগে মসজিদ সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু এসব সংস্কার নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি।
একদিকে স্থানীয় মুসল্লিদের দাবি ছিল—বর্ধিত জনসংখ্যা ও আধুনিক প্রয়োজনের কারণে মসজিদ বড় করা জরুরি। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ ও প্রতœতত্ত্ববিদদের আশঙ্কা ছিল—অতিরিক্ত আধুনিকায়নের ফলে মুঘল আমলের মূল কাঠামো ও ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মূল তিন গম্বুজ, প্রাচীন মিহরাব ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক নকশা সংরক্ষণ না হওয়াকে অনেকেই ঐতিহাসিক অবহেলা হিসেবে দেখেন।
এই দ্বন্দ্ব আজও পুরোপুরি নিরসন হয়নি। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং আধুনিক ব্যবহার এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আজিজুল হক নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘চকবাজার শাহী মসজিদকে ঘিরে যে বিতর্ক সবচেয়ে বেশি, তা হলো সংস্কার ও সংরক্ষণের ভারসাম্য। আধুনিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্য আড়ালে চলে গেছে। বিষয়টি দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ নামাজ আদায় করেন। তাই প্রয়োজন এমন সংস্কার, যেখানে ঐতিহ্য নষ্ট না করে ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ছাড়া এই ঐতিহাসিক নিদর্শন ভবিষ্যতে তার স্বকীয়তা হারাতে পারে।’
নগরজীবনে ভূমিকা
চকবাজার শাহী মসজিদ পুরান ঢাকার নগরজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও জুমা, ঈদ ও রমজানের সময় এখানে হাজারো মানুষের সমাগম হয়। রমজান মাসে চকবাজার এলাকার ইফতার সংস্কৃতির সঙ্গে এই মসজিদ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মসজিদের আশপাশে বসে ঐতিহ্যবাহী ইফতার বাজার, যা ঢাকার সংস্কৃতিতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
এছাড়া চকবাজার অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের দৈনন্দিন জীবনে এই মসজিদ একটি মানসিক আশ্রয় ও ধর্মীয় স্থিরতার জায়গা হিসেবে কাজ করে। নামাজের পাশাপাশি এখানে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন শিক্ষা এবং সামাজিক সহমর্মিতার চর্চা চলে।

আমিরুল দেওয়ান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘পুরান ঢাকার নগরজীবনে চকবাজার শাহী মসজিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ব্যস্ত বাজার, সংকীর্ণ গলি আর কোলাহলের মাঝেও এই মসজিদ এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তির জায়গা। বিশেষ করে রমজান মাসে এর চারপাশে যে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়, তা ঢাকার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইফতার সংস্কৃতি, নামাজ ও মানুষের মিলনমেলা সব মিলিয়ে এই মসজিদ ঢাকার সামষ্টিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।’
সংরক্ষণ প্রসঙ্গ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
চকবাজার শাহী মসজিদ সংরক্ষণ প্রসঙ্গ আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ঢাকার ইতিহাসের একটি মূল্যবান অধ্যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিকল্পিত সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া হলে এখনো এর ঐতিহাসিক অংশগুলোকে আংশিক হলেও রক্ষা করা সম্ভব।
প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা—যেখানে ধর্মীয় ব্যবহার অব্যাহত থাকবে, একই সঙ্গে ঐতিহাসিক কাঠামোর স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষিত হবে। ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, স্থাপত্য জরিপ, এবং ঐতিহাসিক অংশগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
চকবাজার শাহী মসজিদ পুরান ঢাকার ইতিহাসের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী সাক্ষী। মুঘল আমলের স্থাপত্য, উপনিবেশিক ও আধুনিক সময়ের পরিবর্তন, এবং আজকের ব্যস্ত নগরজীবন—সবকিছুর ছাপ বহন করে এই মসজিদ।
শত পরিবর্তনের মধ্যেও এটি ধর্মীয় আস্থা, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে আছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা শুধু দায়িত্ব নয়, বরং ঢাকার আত্মপরিচয় রক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত।
এম/এএইচ