নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২১ পিএম
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম (৫৫) বলেন, ‘ভোট মানেই আমাদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ। যিনি বাজারের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবেন, তাকেই ভোট দেব।’ তার মতে, রাজনীতি নয়, প্রয়োজন কাজের মানুষ। যিনি ব্যবসায়ীদের সব সমস্যার সমাধান করবেন, তাকেই তারা চান। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় কথা বলার সময় এসব কথা বলেন তিনি।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভোট, প্রার্থী ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
নিউ মার্কেট এলাকা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি রাজধানীর মধ্যবিত্ত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা ও বিক্রেতার আনাগোনায় মুখর এই এলাকার দোকানগুলোতে এখন ব্যবসার পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দোকানের কাউন্টার, চায়ের দোকান কিংবা গুদামের ভেতরে সর্বত্রই ঘুরে ফিরে আসে ভোটের হিসাব, প্রার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আগামী দিনের অনিশ্চয়তার কথা।
এখানকার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তবে নীতিনির্ধারণের প্রভাব যে তাদের দৈনন্দিন ব্যবসায় পড়ে, সে বিষয়ে তারা সচেতন। একজন কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, সরকার বদল মানেই নীতির বদল। ভ্যাট, ট্যাক্স ও আমদানি নীতির প্রভাব সরাসরি দোকানের বিক্রিতে পড়ে। তাই ভোট দেওয়ার সময় তারা শুধু দল নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখেন।
নিউ মার্কেটের পুরোনো ব্যবসায়ীরা অতীতের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে তুলনামূলক বেশি বাস্তববাদী। তাদের ভাষায়, নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি অনেক আসে, কিন্তু বাস্তবায়ন কম হয়।
জুতা ব্যবসায়ী কাউসার জানান, নির্বাচনের সময় বাজার উন্নয়ন, পার্কিং সমস্যার সমাধান ও নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়। তবুও ভোট না দিয়ে উপায় নেই। এবার তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চান।
তরুণ ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের ভোট ভাবনায় কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা যায়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং প্রার্থীদের বক্তব্য ও কর্মসূচি তুলনা করে দেখেন।
মোবাইল অ্যাকসেসরিজ বিক্রেতা মাহমুদ বলেন, তারা এমন প্রতিনিধি চান, যিনি ডিজিটাল লেনদেন সহজ করবেন, অনলাইন ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করবেন। তাদের কাছে রাজনীতি মানে বাস্তব সুবিধা, যে সেই সুবিধা দিতে পারবে, তাকেই তারা ভোট দেবেন।
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের ভোট ভাবনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সহিংসতার কারণে দোকান বন্ধ রাখতে হলে তারা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
বই বিক্রেতা তানভীর হোসেন বলেন, হরতাল বা সংঘর্ষের দিনে বিক্রি শূন্যে নেমে আসে, অথচ ভাড়া ও কর্মচারীর বেতন ঠিকই দিতে হয়। তাই তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে।
পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে বিক্রিও কমে যায়।
গৃহস্থালি পণ্য বিক্রেতা মামুনুর রশীদ বলেন, মানুষ এখন প্রয়োজন ছাড়া কিছু কিনছে না। নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সরকার আসুক, যারা বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের ভোট ভাবনায় দলীয় আবেগের চেয়ে বাস্তব চাহিদাই বেশি গুরুত্ব পায়। উন্নত অবকাঠামো, যানজট নিরসন, পার্কিং সুবিধা, নিরাপত্তা ও ব্যবসাবান্ধব নীতি—এসবই তাদের প্রধান দাবি। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে এই বাজারের প্রতিটি দোকানে ভোটের আলোচনা আরও তীব্র হবে। কারণ তাদের কাছে ভোট শুধু রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং জীবিকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
এম/এআর