ঢাকা মেইল ডেস্ক
৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজের ধরন, সময়সীমা ও প্রক্রিয়াগত কাঠামো নিয়ে একাধিক অস্পষ্টতা ও সম্ভাব্য আইনি জটিলতার প্রশ্ন সামনে আসছে।
নির্বাচনের পর সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকেও একটি ব্যাখ্যামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে গণভোটে অংশ নেবেন ভোটাররা। সেখানে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন তারা।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই দফা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। একটি শপথ হবে সংসদ সদস্য হিসেবে, আর অন্যটি হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দুই ভূমিকায় শপথ নেবেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন, স্পিকার নির্বাচন, বাজেট প্রণয়নসহ সংসদের নিয়মিত সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের কার্যক্রম সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ না হলে কী হবে, সে বিষয়েও এখনো কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
এ অবস্থায় বিদ্যমান সংবিধান ও সংসদ বহাল রেখে আলাদাভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। ভবিষ্যতে এ সিদ্ধান্ত কোনো আইনি জটিলতা সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই যদি আইন অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের কাজটি করতে পারেন, তাহলে আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন কিংবা ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?

সরকার যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে
বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পতনের পর দায়িত্ব নিয়েই সংস্কার ইস্যুতে কাজ শুরু করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
সংবিধান, নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গঠিত সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এ রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরের পর এটি বাস্তবায়নে অবিলম্বে সরকারি আদেশ জারি করে একটি গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে ঐকমত্য কমিশন।
সিদ্ধান্ত হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ প্রশ্নেও মতামত দেবেন সাধারণ ভোটাররা। যেখানে চারটি বিষয়ের ওপর করা একটি প্রশ্নে ‘হ্যা’ বা ‘না’ এর পক্ষে রায় জানাবেন তারা।
পরবর্তীতে সাংবিধানিক বিষগুলোতে আসা গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের পর সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই জুলাই জাতীয় সনদ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তাহলে আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন হলো কেন?

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটো শপথ নেবেন, একটা হচ্ছে রেগুলার পার্লামেন্ট হিসেবে, যারা লম্বা সময় ধরে সংবিধানে পাঁচ বছরের কথা বলা আছে কাজ করবেন।
তিনি বলেন, পাশাপাশি আরেকটি শপথ নেবেন যেটা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই সংস্কারগুলো তারা অন্তর্ভুক্ত করবেন আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে এর ভিত্তিতে যা যা করার সেগুলো তারা করবেন।
>> আরও পড়তে পারেন
গণভোটের পর সরকারের মেয়াদ বাড়ছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন: সিএ প্রেস উইং
প্রত্যেকেই যাতে দ্রুততার সঙ্গে কাজগুলো শেষ করার তাগিদ অনুভব করেন এ কারণেই সময় দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, যে রাজনৈতিক দলগুলো আলাপ আলোচনা করেছে তাদেরকে বলে দেওয়া যে আপনারা ১৮০ দিনের মধ্যে কাজগুলো করে ফেলেন।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হয় তাহলে কী হবে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি বলেও জানান আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, এটা চাপ নয় এটা কেবল স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
তিনি বলছেন, বিদ্যমান আইন ও সংবিধান অক্ষুন্ন রেখে জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ সম্ভব নয় বলেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি আলাদাভাবে আসছে।
যে কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো প্রয়োজন এই অবস্থায় যদি আগের জায়গায় ফিরে যায় তাহলে পরিবর্তনের যে আকাঙ্খা তৈরি হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হবে না। কারণ বিদ্যমান সংবিধানে দেশের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন সম্ভব নয়, বলেন তিনি।

আইনি জটিলতা হতে পারে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদ। আর সংবিধান হলো রাষ্ট্র বা সংগঠনের মূল ভিত্তি, নীতি ও সর্বোচ্চ আইন। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যরা সংসদে বসে আইন প্রণয়নের কাজ করেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে এখানেই প্রশ্ন তুলছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধান বহাল থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারতো।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলছেন, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো আপনারা সংসদে পাশ করতে চাচ্ছেন, পাশ করার পদ্ধতি আমাদের সংবিধানের আর্টিকেল ১৪২ এই উল্লেখ করা আছে।
তিনি বলছেন, যারা সংসদ সদস্য হচ্ছেন, তারাই যদি এটি করতে পারেন তাহলে আবার আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে আলাদা ক্ষমতা দেওয়ার কি প্রয়োজন ছিল?
এক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি জটিলতায় পড়ার শঙ্কা রয়ে যায় বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের কাছে তো আছে সংবিধান, তারা তো ওইটার গুরুত্ব দেবে। রাজনীতি আর আইন তো দুই ধরনের জিনিস।
এছাড়া একটি গেজেটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য তৈরি এবং তাদেরকে আলাদা ক্ষমতা দেওয়ার প্রক্রিয়া সংসদের পাশাপাশি আরেকটি সমকক্ষ সংস্থা তৈরি করছে, যা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে।
উদাহরণ দিয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, ধরেন আপনি ভাতও রাঁধেন বিরিয়ানিও রাঁধেন, তাহলে আপনাকে দুইটা চুলায় বসাতে হবে। একই চুলায় যদি ভাতও বসান বিরিয়ানিও বসান তাহলে ওইটা ভাতও থাকবে না বিরিয়ানিও থাকবে না।
সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের এই বিপরীত অবস্থানের কারণে যে আইনি বিতর্ক তৈরি হবে, তাতে সব কিছুই যেন ভেস্তে না যায়- এই শঙ্কাও রয়েছে বিশ্লেষকদের।
>> আরও পড়তে পারেন
মনজিল মোরসেদ বলেন, এই সংবিধানে শপথ নিয়ে বিচারকরা বসে আছেন, এই সংবিধান যারা ক্ষমতায় গেলো তারা এক ধরনের সংশোধন করলো, অন্য যারা সংসদে সদস্য হবেন তারা হয়তো আরেকটা করলেন, সব মিলিয়ে যখন আদালতে যাবে তখন অন্যরা যেটা করলেন সেটা তো কোর্ট রেকগনাইজ করবে না।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান অনুযায়ী যদি করা হতো, তাহলে এই ধরনের কোনো বিতর্ক আসতো না বলেই মনে করেন তিনি।
যদিও বিতর্ক বা শঙ্কা তৈরির সুযোগ নেই বলেই মনে করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তার মতে, মৌলিক সংস্কার বা পরিবর্তন বিদ্যমান সংবিধান দিয়ে সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, এটা সমস্যা হতো যদি দুটো সেপারেট বডি হতো কিন্তু এখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং জাতীয় সংসদ দুই ক্ষেত্রে একই সদস্যরাই থাকছেন। আর তারা জুলাই জাতীয় সনদ তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যেও ছিলেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, সংবিধানে কিছু মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে বলেই একই সাথে সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাজ চালানোর কথা বলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত সংসদের মাধ্যমে মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত নাও হতে পারে।
তিনি জানান, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক সংস্কার করার সুযোগ সীমিত বলেই বিষয়টি নিয়ে অতীতেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এক্ষেত্রে মনজিল মোরসেদ বলছেন, পনের বছরের ইতিহাস আমাদেরকে কিছুটা ভালো করার জায়গা সৃষ্টি করে দিয়েছে, আমরা একমতও হয়েছি কিন্তু ভবিষ্যতে চলার পথে এমন কোনো সিস্টেমে আমরা না পড়ে যাই যাতে আবারো পেছনে ফিরে যাই।

সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনার চলছে।
নির্বাচনের পরও ছয়মাস ক্ষমতায় থাকতে পারে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার- এমন একটা আলোচনাও এসেছে।
বিশেষ করে ‘গণভোটে হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে ছয় মাস পরে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে ইউনূস সরকার,’ সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ফেসবুক পেজ থেকে এ বিষয়ক একটি ফটোকার্ড শেয়ার করার পর এই আলোচনা বাড়তি মাত্রা পায়।
বৃহস্পতিবার রাতে ‘সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস্’ নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এই বিষয়ে একটি পাল্টা পোস্ট দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। তাতে ওই ধরনের আলোচনার বিষয়কে অসত্য বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে- এমন কথা বলেননি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বরং নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই এই দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

এছাড়াও, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর কথা উল্লেখ করে ওই পোস্টে বলা হয়েছে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে সংসদের দ্বৈত ভূমিকা থাকবে।
‘যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ একইসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন।’ অর্থাৎ সরকার হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই কাজ করবেন, অন্তর্বর্তী সরকার নয়।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর সাত নম্বর অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে ওই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, জনপ্রতিনিধিগণ একদিকে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন, অন্যদিকে একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কারের গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
আদেশ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিলুপ্ত হবে। তখন থেকে সংসদের আর দ্বৈত ভূমিকা থাকবে না; জনপ্রতিনিধিগণ কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা
/এএস