মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
ক্যান্টিনের অর্ডার না পাওয়ায় তেজগাঁও কলেজের এক বাবুর্চিকে চোখ বেঁধে পেটানোর এবং চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে।
তবে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে নির্যাতনকারী ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী এখনো কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেননি।
ভুক্তভোগীর বাবুর্চির নাম আবুল কাশেম। তিনি তেজগাঁও কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। দীর্ঘ ৩৭ বছর কলেজটির ক্যান্টিনে রান্নাবান্না করছেন।
অন্যদিকে অভিযুক্তের নাম আল-আমিন হোসেন রাসেল। তিনি কলেজটির ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি কলেজের ক্যান্টিন পরিচালনা করেন। দলীয় পরিচয়ে এই কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার কলেজটির পরিসংখ্যান বিভাগের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বাবুর্চি আবুল কাশেমকে রান্নার জন্য নেন। তিনি কলেজের ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে রান্না করে দিয়ে আসেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তাকে ফোন করে ডেকে নেন ছাত্রদল নেতা আল-আমিন হোসেন রাসেল।
অভিযোগ, বাবুর্চি আবুল কাশেম কেন এবং কার অনুমতি নিয়ে ফিনান্সিয়াল বিভাগের অনুষ্ঠানে রান্না করতে গেছেন- এই প্রশ্ন তুলে তাকে গালিগালাজ করা হয়। পরে তাকে কলেজটির একটি কক্ষে নিয়ে লাইট বন্ধ করে চোঁখ, হাত-পা বেঁধে টানা চার ঘণ্টা বেধড়ক পেটান ওই ছাত্রদল নেতা ও তার সহযোগীরা।
আরও অভিযোগ, নির্যাতনের একপর্যায়ে বাবুর্চি আবুল হোসেনের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আল-আমিন রাসেল। শেষমেশ পাঁচ হাজার টাকায় রফাদফা হয়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী ঘটনাটি কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো বিষয়টি চেপে যায়।
কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রদল নেতা আলম-আমিন রাসেল যে ক্যান্টিন পরিচালনা করেন, সেটিতে কেন ফিনান্সিয়াল বিভাগ খাবারের অর্ডার করেনি, সেই রাগ এবং ক্ষোভে তিনি বাবুর্চি আবুল কাসেমকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালান।
ভুক্তভোগী আবুল কাসেমের ছেলে সাইমন হাসান আসিফ জানান, তার বাবা সেখানে দীর্ধদিন ধরে রান্নার কাজ করেন। সেদিন (বৃহস্পতিবার) তার বাবাকে কলেজের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে একটি কক্ষে নিয়ে লাইট বন্ধ করে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটানো হয়।
আসিফের অভিযোগ, প্রথমে তার বাবার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। তখন বাসা থেকে ৫ হাজার টাকা ম্যানেজ করে দেওয়ার কথা বলেন আবুল কাশেম। তারা (অভিযুক্তরা) সেই টাকা নেওয়ার জন্য তাদের বাসায় দুজনকে পাঠায়।
এসময় ‘সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে তোর দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে আসা হবে এবং তাদেরও মারধর করা হবে’ বলে ছাত্রদল নেতা রাসেল হুমকি দেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর ছেলের। তিনি জানান, এরপর তার বাবা ৫ হাজার টাকা দিয়ে এবং রাসেলের পা ধরে আকুতি মিনতে করে ছাড়া পান। বিষয়টি অধ্যক্ষকে জানালে তিনি বলেন, আপনি কয়েকদিন রেস্ট নেন। এরপর আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
আসিফের আরও জানান, তারা (অভিযুক্তরা) ক্যান্টিনের পাঁচতলায় তিন-চার ঘণ্টা লাইট অফ কইরা চেয়ারের সঙ্গে বাইধা মারছে আব্বারে। বুকে ঘুসি মারছে, হাতে-পায়ে মারছে। এ কাজ করছে রাসেল ও শিমুল।
তিনি বলেন, ‘এই সময়ে একটি টর্চার সেলে নিয়ে মারধর, ভাবা যায়!’ তার প্রশ্ন, ‘৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসীরা এত সাহস পায় কোথা থেকে?’
বিচার চেয়ে ও নিন্দা জানিয়ে আসিফ বলেন, ‘পুরো কলেজটিকেই যেন তারা একটি টর্চার সেলে পরিণত করেছে। এই নৃশংস ঘটনার বিষয়ে আমরা আমাদের পরিবার থেকে সেনাবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছি। এখন আমাদের জীবন ঝুঁকিতে। আমরা থানায় জিডি করব।’
অন্যদিকে ভুক্তভোগী আবুল কাসেম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গত মাসের ১ তারিখে আমি অবসরে গেছি। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার আরও এক বছর সময় বাড়াইছে। দীর্ঘ ৩৭ বছর চাকরি করলাম। অবসরে গেলেও রান্না জানায় আমাকে ডেকে নেয়। তারা পছন্দ করায় আমাকে রান্না করাইছে।
তার অভিযোগ, ‘আমাকে সাড়ে চারটার দিকে ডেকে নেয় এবং বলে, কে তোরে অনুমতি দিছে রান্না করার? মা-বাপ তুলে গালাগালির পর বলে, তুই আজকে রান্না করছোস যে ১০ হাজার টাকা পাইছোস, সেটা দিবি। কারণ তোর জন্য আমার ক্যান্টিনের লস হইছে। আমার ১০ হাজার টাকা লস হইছে, সেটা দিবি। আর আওয়ামী লীগের সময় যেহেতু অনেক কামাইছিস, তার জন্য ৫০ হাজার দিবি।’
আবুল কাশেমের আরও অভিযোগ, ‘তারা (অভিযুক্তরা) আমার মাথা এবং মুখে একসঙ্গে ঘুসাইছে। টাকা না দিলে তারা আমার হাত কাটবে, পা কাটবে বলেছে। সহযোগীদের অর্ডার দিছে, আমার ছেলে দুইটারে উঠায় নিয়া আসবে। পরে বিষয়টি প্রিন্সিপাল ম্যাম ও গর্ভনিং বডির সবাইকে জানাইছি। কিন্তু কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রাসেল তার সহযোগীদের আমার বাসায় ৫ হাজার টাকা আনার জন্য পাঠাইছিল।’
তিনি কান্নাজড়িক কণ্ঠে আরও বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েরা সবাই অনার্স-মাস্টার্স পাস। কিন্তু যে কলেজে ৩৭ বছর রান্নার কাজ করলাম, সেই কলেজের এক ডিগ্রি পাস ছেলে আমাকে এভাবে মারধর করল!’
অভিযোগ রয়েছে, এর আগে ছাত্রদল নেতা আল-আমিন রাসেল তেজগাঁও কলেজের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে এনসিপির এক নেতাকে নির্যাতন করেছিলেন। প্রায়ই তিনি এমন কাণ্ড ঘটান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস করে না।
এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আল-আমিন রাসেলের ব্যক্তিগত নম্বরে কয়েক দফা কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে তেজগাঁও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামীমা ইয়াসমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে আবুল কাসেম সেদিন রাতেই জানিয়েছে। সে তো ভয় পাচ্ছিল, যাতে বিষয়টি কেউ না জানে। রাসেল আমাদের কলেজের ছাত্র নয়। সে ক্যান্টিন চালায়। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, তার জন্য রাসেলের চুক্তি বাতিল করব। সে যা করেছে, তা অন্যায়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাসেলকে রক্ষার জন্য আনোয়ার হোসেন নামে বিএনপির এক স্থানীয় নেতা নানা চেষ্টা করছেন। রাসেলও বিষয়টি ধামাচাপা দিতে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ধরছেন। আজ রাতে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত-উভয় পক্ষকে নিয়ে বসার কথা রয়েছে।
এমআইকে/এএইচ