images

জাতীয়

‎গুলশানে তরুণীকে হত্যা: চার দিনেও রহস্য অজানা

আব্দুল কাইয়ুম

২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

‎* তীব্র কোনো ক্ষোভ থেকে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে: পুলিশ 
‎* সব সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট হওয়ায় ঘাতকদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না 
‎* জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে সাবেক স্বামী ও ঘনিষ্ঠজনদের

‎রাজধানীর গুলশানের একটি বাসায় তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে গত ১৮ জানুয়ারি (শনিবার) সাদিয়া রহমান মিম (২৭) নামে এক তরুণীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি একটি বারের নাচিয়ে ছিলেন। পাশাপাশি পার্লারের ব্যবসা করতেন বলে জানান স্বজনরা। এ ঘটনায় নিহতের বোন সাহিদা আক্তার বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। হত্যার চার দিনেও এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। 

গলাকেটে হত্যা করার পর কারা ঘর তালাবদ্ধ করলো, কী কারণে তার মোবাইল ফোনগুলো নিয়ে গেলো? এমন নানা প্রশ্ন সামনে রেখে তদন্ত করছে পুলিশ।
 
‎শনিবার (১৮ জানুয়ারি) দিবাগত গভীর রাতে গুলশানের কালাচাঁদপুর পাকা মসজিদ পশ্চিম পাড়ার ক-৮৯ নম্বর বাসা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
 

image
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতীকী ছবি

এই ‎হত্যাকাণ্ড নিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন, আমরা বেশ কয়েকটি সূত্র নিয়ে সামনে এগুচ্ছি। যেমন: পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। আবার এমন হতে পারে ভুক্তভোগী যেহেতু বারে নাচতেন, সেক্ষেত্রে কারো গোপন কিছু তার কাছে ছিলো, যার ফলে তীব্র ক্ষোভ থেকে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এছাড়াও তার পূর্বের যে স্বামী ছিল, তাদের সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করছি।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর চার দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘাতকরা তরুণীকে হত্যার পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো নিয়ে যায়। পুলিশ বলছে, যে বাড়িতে হত্যা সংঘটিত হয়েছে সেই বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট। আশপাশের প্রায় সব বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে আছে। দূরের কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা সচল থাকলেও সেসব সিসি ক্যামেরা থেকে ঘাতকদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। 

‎মরদেহ উদ্ধারের বর্ণনায় পুলিশ জানায়, নিহত সাদিয়ার মরদেহ গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি মুখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে,পূর্ব শত্রুতার জেরে তীব্র ক্ষোভ থেকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। 

 
‎এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সাদিয়া রহমান মিমের বোন সাহিদা আক্তার ঢাকামেইলকে বলেন, আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে, এটা আমরা জানতেই পারিনি। তার সঙ্গে সবশেষ শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে কথা হয়েছিল। এরপর বিকেলে কয়েকবার ফোন করার পর তার ফোন বন্ধ পাচ্ছিলাম। পুরো প্রায় এক দিন তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করেছিলাম। কিন্তু ফোন বন্ধ। একপর্যায়ে তার রুমমেট নুসরাতকে আমি ফোন করি। তখন সে জানায়, মিম গ্রামে গেছে, মিমের কী হয়েছে সে বলতে পারবে না। 
 
মিমের বোন ঢাকামেইলকে বলেন, শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) থেকে শনিবার পর্যন্ত আমার বোন সাদিয়ার কোনো খবর না পেয়ে বাধ্য হয়ে শনিবার দুপুরে ঢাকায় রওয়ানা হই। আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ঢাকায় এসেই আমার বোনের কালাচাঁদপুর এলাকায় বাসায় এসে দরজায় তালা দেখতে পাই।  

 

 

‘এরপর বাড়ির মালিক ও আশপাশের লোকজনকে খবর দিলে তারাসহ এসে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি আমার বোনের ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে লাশের অবস্থা দেখে সিআইডিসহ অন্যান্য সংস্থাকে খবর দেয়। এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে আমার বোনের মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যায়।’ বলেন সাহিদা। 

‎বোন হত্যার বিচার চেয়ে সাহিদা বলেন, এ ঘটনায় আমার বোনকে হত্যা করার মতো কাউকে তেমন সন্দেহ হচ্ছে না। আমার বোন নিজেকে নিজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে শুধু। সে সব সময় চেষ্টা করতো নিজে নিজে কিছু করা। এজন্য সে একটা পার্লারের ব্যবসা দিয়েছে। আমার বোনকে যারা হত্যা করেছে, পুলিশ এখনো তাদের কেন খুঁজে বের করতে পারলো না। কেন এমন নৃশংসভাবে আমার বোনকে হত্যা করা হলো, আমি খুনীদের চেহারা দেখতে চাই।

‎মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মারুফ আহমেদ বলেন, হত্যার পর ভুক্তভোগীর দুইটা মোবাইল ফোন ঘাতকরা নিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি রিয়েলমি আরেকটি আইফোন ১২। মোবাইল ফোনগুলো বন্ধ করে রাখায় তা ট্র্যাকিং করে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও যে বাসায় তাকে হত্যা করা হয়েছে সেই বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট। বাড়িটির আশপাশে অনেক সিসিটিভি ক্যামেরাও নষ্ট হওয়ায় কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরও আমরা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিকে শনাক্তের চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে আমরা ভুক্তভোগীর রুমমেটসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছি। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমরা ছেড়ে দিয়েছি।

এসআই মারুফ বলেন, আমরা বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে নিয়ে এগুচ্ছি। এর মধ্যে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। অন্যদিকে, সে যেহেতু বিভিন্ন বারে ড্যান্সার হিসেবে কাজ করতো, সেখানে হয়তো কোনো ব্যক্তির ভিডিও বা কোনো ডকুমেন্টস তার কাছে ছিল, যার ফলে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও ভুক্তভোগীর আগে দুইটি বিয়ে হয়েছিলো। তাদের মধ্যে সম্প্রতি যেই স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছে তার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তিনি একজন সৌদি প্রবাসী। আমরা সব তথ্য মিলিয়ে আসামিদের গ্রেফতারের জন্য কাজ করছি।
 
একেএস/ক.ম