নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি ও নাগরিক সমাজের সংগঠন। তাদের অভিযোগ, জনগণের অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোটের উদ্যোগে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন পরিবেশ, উন্নয়ন ও শ্রম অধিকারভিত্তিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের নেটওয়ার্ক অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বহুমাত্রিক ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এই পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মনোয়ার মোস্তফা বলেন, অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে যেভাবে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার একটি কাঠামো তৈরি করছে। এর ফলে দেশ দীর্ঘদিনের জন্য ব্যয়বহুল ও পরিবেশবিধ্বংসী জ্বালানি ব্যবস্থার ফাঁদে আটকে পড়তে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিডব্লিউজিইডির সদস্যসচিব হাসান মেহেদী বলেন, খসড়া এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো ধরনের জনশুনানি বা উন্মুক্ত জাতীয় পরামর্শ ছাড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আগের সরকারের অস্বচ্ছ নীতি প্রণয়নের ধারারই পুনরাবৃত্তি।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণা পরিচালক শিমন উজ্জামান বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে নাগরিক সমাজকে পাশ কাটিয়ে আবারও সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনার মতো একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা সামনে আনা হতাশাজনক। এতে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য জটিলতা তৈরি হবে।
ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দীন শামীম বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশ ও মানবাধিকার মানদণ্ডের কারণে দেশের রপ্তানি খাত গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
>> আরও পড়তে পারেন
‘যথেষ্ট সংস্কার হয়েছে, তবে পুলিশ সংস্কার যেভাবে চেয়েছি সেভাবে হয়নি’
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি ২০২৫) অবিলম্বে স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
২. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
৩. জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
৪. বিতর্কিত বিশেষ বিধান ও অস্বচ্ছ আইনি কাঠামো ব্যবহার বন্ধ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত ও পরিবেশসম্মত নীতি অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. নবনির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি নতুন, দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এএইচ/এএস