নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:১৪ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের ৭০ লাখ শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১২ দফা দাবি তুলে ধরেছে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত সভায় তারা এই দাবিসমূহ তুলে ধরে।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: রিকশা শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অঙ্গীকার’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রিকশা শ্রমিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম মাইজভান্ডারি। তিনি বলেন, ৭০ লাখ শ্রমিকের রুটি-রুজি রক্ষায় রাজনৈতিক দল ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ রিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর নীতিমালা না থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা আজও নিরাপদ হয়নি। ফলে শ্রমিক ও তাদের পরিবারসহ প্রায় সাড়ে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ রুটি-রুজির অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বক্তারা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কাছে রিকশা শ্রমিকদের এই প্রত্যাশা ও দাবি তুলে ধরতেই এই আলোচনা সভার আয়োজন। রিকশা একটি জৈব জ্বালানিবিহীন, পরিবেশবান্ধব ও ঐতিহ্যবাহী বাহন। অথচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এসেও দেশের লাখ লাখ রিকশাচালক মানুষ হয়ে মানুষ টানতে বাধ্য হচ্ছেন। উন্নত বিশ্বে যেখানে পশু দিয়ে অতিপরিশ্রমের কাজ নিরুৎসাহিত করা হয়, সেখানে জীবিকার তাগিদে আমাদের দেশের মানুষকে অমানবিক শ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে। এ অবস্থা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। তাই রিকশার যান্ত্রিকীকরণ এখন একটি মানবিক কর্তব্য।
সভায় জানানো হয়, ব্যাটারিচালিত যানবাহন দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (সিএলইএএন)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশা খাত বছরে প্রায় ৯৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক অবদান রাখছে। এই খাত থেকে সরকার নিয়মিত রাজস্ব আদায় করতে পারলেও কার্যকর নীতিমালা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।
বক্তারা আরও বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের লাইসেন্স প্রদানের একমাত্র যোগ্য প্রতিষ্ঠান হলো বিআরটিএ। কারণ সড়ক ও পরিবহন আইন অনুযায়ী যান্ত্রিক যানবাহনের লাইসেন্স প্রদানের এখতিয়ার বিআরটিএ-এর। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব দিলে দুর্নীতি, বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সভায় আরও বলা হয়, ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ে নীতিমালার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও হয়রানি চলছে। অতীতে কার্ড ব্যবসার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে, যার সঙ্গে অসাধু রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। বক্তারা অবিলম্বে এই লুটপাট বন্ধ করে বিআরটিএ-এর মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান এবং আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের দাবি জানান।
আলোচনা সভা থেকে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ১২ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
দাবিসমূহ—
১. আধুনিকায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করে দেশের সড়ক উপযোগী মডেলে আধুনিকায়নসহ বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স ও রুট পারমিট প্রদান এবং যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। আধুনিকায়নের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।
২. বিআরটিএ কর্তৃক ব্যাটারিচালিত যানবাহন চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে এবং লাইসেন্স প্রদান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত যানবাহন আটক বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করতে হবে।
৩. অবিলম্বে জরিপের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক অটোরিকশার সংখ্যা ও মালিকানা নির্ধারণ করে আনুপাতিক হার পদ্ধতিতে সকলের লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দেশের সড়ক উপযোগী মডেল সকলের জন্য উন্মুক্ত করে বাহনসমূহের আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে এবং বাহন বিনিময় নীতি শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে নির্ধারণ করতে হবে।
৫. শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে।
৬. ব্যাটারিচালিত যানবাহন শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। অবৈধ কার্ড ও টোকেনের নামে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. ব্যাটারিচালিত যানবাহন গ্যারেজের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করতে হবে।
৮. বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। সকল সড়কে সার্ভিস লেন নির্মাণ এবং বাস্তবসম্মত ট্রাফিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৯. নিত্যপণ্যের ভ্যাট কমাতে হবে এবং শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বাসস্থান, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
১০. ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন হিসেবে শিল্পের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং এক অংকের সুদে জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
১১. জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংক্রান্ত সকল রিট দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
১২. রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিকদের নাগরিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে অমানবিক শ্রম থেকে মুক্ত করতে হবে।
এএইচ/এএস