images

জাতীয়

‘রিকশা ট্র্যাপার’ এখন নগরবাসীর গলার কাঁটা!

আব্দুল হাকিম

০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৫ এএম

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও প্যাডেলচালিত রিকশার দাপট নিয়ন্ত্রণে ‘ট্র্যাপার’ বসিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবে তা এখন উল্টো নগরবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিকশা নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো এই ব্যয়বহুল ধাতব কাঠামো কার্যত তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এতে বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য যানবাহন।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, যেসব স্থানে রিকশা ট্র্যাপার বসানো হয়েছে, সেসব জায়গায় ব্যাটারিচালিত ও প্যাডেলচালিত রিকশা অনায়াসেই পার হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রিকশাচালকরা সামান্য বাঁক নিয়ে অথবা চাকা তুলে সহজেই ট্র্যাপার অতিক্রম করছেন। অথচ একই স্থানে ধীরগতিতে পার হতে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকরা। কোথাও টায়ার ফেটে যাচ্ছে, কোথাও চেসিসে ধাতব কাঁটা লেগে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রাংশ।

মিরপুর ৬, মিরপুর ১০, গুলশান ও রমনাসহ একাধিক এলকার গলিতে গিয়ে দেখা যায়, রিকশা আটকানোর জন্য বসানো ট্র্যাপারের ফাঁকগুলোতে জমে গেছে কাদা, মাটি, সুরকি ও খোয়া। ফলে ট্র্যাপারটি এখন কার্যত রাস্তার সমান হয়ে গেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর কাঁটা ও অ্যাংগেল নষ্ট হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। যে যন্ত্রটি রিকশা প্রবেশ ঠেকানোর কথা ছিল, সেটিই এখন রিকশার স্বাভাবিক চলাচলের পথে পরিণত হয়েছে।

Rikshawমিরপুর ৬ নম্বর এলাকা দিয়ে চলাচলকারী প্রাইভেটকার চালক মানিক মিয়া বলেন, প্রতিদিনই তাকে এই ট্র্যাপারের ওপর দিয়ে যেতে হয়। রিকশা ঠিকই চলে যাচ্ছে, অথচ গাড়ি নিয়ে যেতে হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কভাবে। একাধিকবার তার গাড়ির চেসিস ট্র্যাপারের কাঁটায় লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে।
গুলশান ও রমনা এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গুলশানে আটটি এবং রমনাতে সাতটি রিকশা ট্র্যাপার বসানো হয়েছে। 

কালাচাঁদপুর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, রিকশাচালকরা একটু কৌশল অবলম্বন করে সহজেই ট্র্যাপার পার হচ্ছেন। অথচ ট্র্যাপারের উঁচু কাঁটার কারণে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চালকদের প্রায়ই থেমে যেতে হচ্ছে। কোনো যানবাহন ট্র্যাপারে আটকে গেলে মুহূর্তেই ২০ থেকে ২৫ মিনিটের যানজট তৈরি হচ্ছে, যা আশপাশের গলি ও মূল সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে।

গত বুধবার ট্র্যাপার পার হতে গিয়ে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যান আসাদুজ্জামান নামের এক চালক। তিনি বলেন, রিকশার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, বরং ট্র্যাপারের ফাঁদে পড়ছেন মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকেরা। ট্রাফিক পুলিশ একবার ট্র্যাপার বসিয়ে আর খোঁজ নেয় না, এটি আদৌ কাজ করছে কি না।

এ বিষয়ে স্থানীয় যাত্রী ও চালকরা বলছেন, অল্প বৃষ্টিতেই ট্র্যাপারের ফাঁকে কাদা জমে যায়। এতে অ্যাংগেল বা কাঁটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যা হঠাৎ ব্রেক করলে বা ভারসাম্য হারালে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। কোথাও কোথাও ট্র্যাপারের ফাঁক বড় হয়ে যাওয়ায় মোটরসাইকেলের চাকা আটকে যাচ্ছে।

rik-dhakamailরিকশাচালকরাও স্বীকার করছেন, এই ট্র্যাপার তাদের জন্য বড় কোনো বাধা নয়। মিরপুর ১০ এলাকার রিকশাচালক মোজাম্মেল হক বলেন, পেটের দায়ে তারা কোনো না কোনোভাবে পার হয়ে যান। মাঝে মাঝে টায়ার পাংচার হলেও চলাচল বন্ধ হয় না।

ডিএমপির ট্রাফিক রমনা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মেহেদি হাসান শাকিল ঢাকা মেইলকে বলেন, কিছু ফিডব্যাক পাওয়া যাচ্ছে। অনেক রিকশাচালক ভয়ে আসে না, আবার কেউ কেউ পার হয়ে যায়। তবে অন্য যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তাদের কাছে আগে আসেনি বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে ট্রাফিক গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. জিয়াউর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ট্র্যাপারের কারণে কিছুটা হলেও সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তার দাবি, প্রাথমিক কিছু সমস্যা থাকলেও ডিজাইন পরিবর্তন ও মেরামতের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ট্র্যাপারের প্রভাব পুরোপুরি নেতিবাচক নয়।

ডিএমপি সূত্র জানায়, গত মার্চ মাসে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর তিনটি স্থানে প্রথম রিকশা ট্র্যাপার বসানো হয়। পরে তা আরও কয়েকটি এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে রাজধানীতে পাঁচ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং প্যাডেল রিকশাসহ মোট প্রায় ১০ লাখ রিকশা চলাচল করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গত কয়েক বছরে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মূল সড়কে রিকশার উপস্থিতি বেড়েছে, যা যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবৈধ হলেও সেগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শুধু সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এই সমস্যা সমাধান করা যাবে না। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং চালকদের আইনের আওতায় আনাই একমাত্র কার্যকর পথ। ট্র্যাপারের কারণে অন্য যানবাহনের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে এটি শুধু যানজট নয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিকশা আটকাতে গিয়ে যদি উল্টো সাধারণ যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যানজট বাড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে এই ট্র্যাপারের দায় নেবে কে? বিশেষজ্ঞদের মতে, লোক দেখানো এমন পদক্ষেপ বাদ দিয়ে সমন্বিত নীতিমালা ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনাই পারে রাজধানীর রিকশা সংকটের টেকসই সমাধান দিতে।

এ বিষয়ে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সর্বপ্রথম রিকশার জন্মানো ঠেকাতে হবে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেই নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। শুধু ট্র্যাপার দিয়ে হবে না, বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ট্র্যাপারের কারণে অন্য যানবাহনের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। এটি দিয়ে অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’

605571764_4180518532187214_রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রিকশা নিয়ন্ত্রণে এখন যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা শুধু হঠাৎ সিদ্ধান্ত। রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। প্রথমেই দেখা দরকার কেন ঢাকায় এত রিকশা ঢুকছে। আমাদের জানা আছে, যে সব রিকশা পাসপত্রসহ আসে, তা এলপির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। কিন্তু আমদানিতে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। রিকশা যেখানে তৈরি হয়, সেই পর্যায়েও নিয়ন্ত্রণ নেই। আর যারা কিনছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কতটা সম্ভব, সেটাও প্রশ্নের সৃষ্টি করে।’

সাইদুর রহমান বলেন, ‘রিকশা চালানো হয়ে যাচ্ছে, কারণ এটি একটি চাহিদা। ঢাকায় মানুষ রিকশা চায়, সেই চাহিদা পূরণ করতে তারা চালক হয়ে আসছে। সুতরাং, রিকশার চলাচল বন্ধ করতে হলে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। উন্নত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব বিকল্প যানবাহন যদি সরকার হাজির করতে পারে, তখনই অটোরিকশার চাহিদা কমবে। তখন মানুষের পছন্দ স্বাভাবিকভাবে বিকল্পের দিকে যাবে এবং রিকশা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কমে যাবে। সরকার যদি এখন শুধু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রিকশা বন্ধ করার চেষ্টা করে, যেমন ট্রাক দিয়ে চেইন বা বাধা দেওয়া, তা ব্যর্থ হবে। মূল সমাধান হলো উন্নত বিকল্প সিস্টেম হাজির করা, যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে সেই বিকল্প ব্যবহার করতে শুরু করে এবং অটোরিকশার চাহিদা নিজেই কমে যায়।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর পরিচালক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এক নম্বর সমস্যা হচ্ছে এই তারগুলোকে কীভাবে টানবে তার কোনো নীতিমালা নেই। ধরুন, কেউ চাইলে আপনি একটা ডিশের কোম্পানি, আপনি টান নিয়ে চলে গেলেন রাস্তার উপর দিয়ে, গাছের ডালের মধ্য দিয়ে বা যেকোনো জায়গা দিয়ে—নীতিমালাটা দরকার ছিল। এখন তারগুলোকে সুশৃঙ্খল করার জন্য সেই নীতিমালা থাকা প্রয়োজন এবং সেই নীতিমালার সঙ্গে বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে বাধ্য করা দরকার। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। বরং আমরা দেখেছি, বিরোধী সমাবেশগুলো বা সিটি করপোরেশনগুলো মাঠে নেমেছিল, যে আন্ডারগ্রাউন্ডে সব তার নিয়ে যাবে।’

6এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে—ঢাকা শহর যেভাবে গড়ে উঠেছে—হঠাৎ করে সমস্ত তার আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়া অত্যন্ত জটিল। সেই জটিল কাজটি তারা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফিজিবলও ছিল না। যেটা অলরেডি ডেভেলপ শহর, সেটাকে উপরের মাধ্যমে শৃঙ্খলায় আনা কিংবা নিচের মাধ্যমে শৃঙ্খল করা—উভয়ই কঠিন। নতুন শহর হলে আন্ডারগ্রাউন্ড সবচেয়ে ভালো, কিন্তু ইতোমধ্যেই যেটা হয়ে গেছে, সেখানে তা করা সম্ভব নয়। এখানে দুটি বিষয়—একটি হচ্ছে অর্থ ব্যয়, আরেকটি হচ্ছে রি-ডেভেলপমেন্ট ও রিকন্সট্রাকশনের জটিলতা এবং জনদুর্ভোগ। সব মিলে শৃঙ্খলায় আনা উচিত ছিল। উপরের মাধ্যমে কেবল নেওয়া যায়, আইডিয়ালি নতুন শহরে নিচের মাধ্যমে নেওয়া সবচেয়ে ভালো। তবে আমাদের অপশনটি ফেল করেছে, পুরো বিষয়টি ব্যর্থ হয়েছে। এখন আমাদের উচিত নতুন শহর বা এলাকার ক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউন্ডের জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনা করা এবং প্রতিটি সেবা সংস্থাকে বাধ্য করা যে, তাদের কেবল সুশৃঙ্খলভাবে স্থাপন হবে, যাতে দৃষ্টি দূষণ বা নগর দৃশ্য নষ্ট না হয়।’

এএইচ/জেবি/এমআই