Dhaka Mail Logo

তথ্য-প্রযুক্তি

ফোন নম্বর ক্লোন করে যেভাবে জালিয়াতি করা হয়

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩২ পিএম

এখন তথ্যপ্রযুক্তির যেমন অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে, ঠিক তেমনই এর অপব্যবহার করে অপরাধের নতুন নতুন কৌশল বের করেছে সাইবার অপরাধী চক্র। এর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে আতঙ্কজনক ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ফোন নম্বর ক্লোন বা সিম ক্লোনিং জালিয়াতি। কোনো ধরনের পূর্বভাস ছাড়াই সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর হুবহু নকল বা ক্লোন করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেওয়া কিংবা বিভিন্ন প্রতারণা করার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ঠিক কী কী উপায়ে এই জালিয়াতি করা হয় এবং এর পেছনে কোন প্রযুক্তিগত কৌশল কাজ করে, তা জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

১. সিম সোয়াপিং বা জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন সিম তোলা

ফোন নম্বর ক্লোন বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে এটি হলো অপরাধীদের সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল। প্রতারক চক্র নানা উপায়ে টার্গেট করা ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর, জন্মতারিখ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর মোবাইল অপারেটর কোম্পানির কাস্টমার কেয়ার বা কোনো অসাধু ডিস্ট্রিবিউটরের সহায়তায় ভুয়া নথিপত্র দেখিয়ে দাবি করা হয় যে ইউজারের সিমটি হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে অপরাধীরা ওই একই নম্বরে নতুন একটি সিম বা ই-সিম (e-SIM) তুলে নেয়। ফলে আসল ব্যবহারকারীর মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক হঠাৎ করে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অপরাধীদের হাতে থাকা নতুন সিমে সমস্ত কল ও এসএমএস প্রবেশ করতে শুরু করে।

২. উন্নত স্পুফিং সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার

বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন স্পুফিং (Spoofing) সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এই বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে প্রতারকরা যেকোনো ব্যক্তির আসল মোবাইল নম্বরটিকে নিজেদের ফোন কল বা বার্তার প্রদর্শিত নম্বর (Caller ID) হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ, আপনি বা অন্য কেউ যখন সেই নম্বর থেকে কল পাবেন, তখন মনে হবে আপনার পরিচিত বা কোনো ব্যাংক থেকে ফোন করা হয়েছে, অথচ আসল কলটি আসছে অন্য কোনো লুকানো বা আন্তর্জাতিক সোর্স থেকে।

৩. ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার ও স্পাইওয়্যার অ্যাপ

প্রতারকরা অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীদের ফোনে বিভিন্ন আকর্ষণীয় লোভনীয় অফার, ভুয়া লটারি কিংবা অজানা ফাইলের মাধ্যমে ক্ষতিকর স্পাইওয়্যার অ্যাপ বা ম্যালওয়্যার ইনস্টল করিয়ে নেয়। একবার এই ম্যালওয়্যার ডিভাইসের ভেতরে প্রবেশ করলে তা ফোনের ভেতরে থাকা সমস্ত কন্টাক্ট লিস্ট, কল লগ, ব্যক্তিগত তথ্য এবং রিয়েল-টাইমে আসা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) বা ব্যাংক ভেরিফিকেশন কোড গোপনে অপরাধীদের সার্ভারে পাচার করে দেয়।

৪. ওটিপি চুরি এবং আর্থিক অ্যাকাউন্ট দখল

নম্বর ক্লোন বা সিমের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পর অপরাধীরা অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন—বিকাশ, নগদ, রকেট) কিংবা অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাপে প্রবেশ করে। পাসওয়ার্ড রিসেট করার সময় ব্যাংক থেকে যে ওটিপি বা যাচাইকরণ কোডটি পাঠানো হয়, তা সোজা চলে যায় প্রতারকদের ক্লোন করা নম্বরে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চোখের পলকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেট থেকে সমস্ত জমানো টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে বা এজেন্টের মাধ্যমে তুলে নেয় তারা।

প্রতারণা থেকে সুরক্ষার উপায়

ফোন নম্বর ক্লোন বা এই ধরনের ভয়াবহ জালিয়াতি থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক:

হুট করে আপনার মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বা সিমে ‘নো সিগন্যাল’ দেখা দিলে এবং দীর্ঘক্ষণ তা না ফিরলে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করুন।

নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ বা ব্যাংকিং পিন এবং পাসওয়ার্ড কোনো অবস্থাতেই ফোনে আসা কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার করবেন না।

অপরিচিত কোনো লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন এবং মুঠোফোনে কোনো অজানা বা থার্ড-পার্টি অ্যাপ ইনস্টল করবেন না।

আপনার মোবাইল নম্বর বা সিমের সুরক্ষার জন্য অপারেটরদের দেওয়া অতিরিক্ত নিরাপত্তা ফিচারগুলো সক্রিয় রাখুন। সামান্য সচেতনতা ও সময়োপযুক্ত পদক্ষেপই আপনাকে এই বড় ধরনের সাইবার জালিয়াতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

এজেড