নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২২ পিএম
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর আওতায় ভাড়া বৃদ্ধিতে স্বচ্ছ নীতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়িওয়ালার পক্ষ থেকে আগাম লিখিত নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক করতে কাজ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এতে ভাড়াটিয়া অযৌক্তিক চাপ থেকে সুরক্ষিত থাকবেন এবং বাড়িওয়ালা আইনসঙ্গতভাবে ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) গুলশান ডিএনসিসি নগরভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মাদ এজাজের সভাপতিত্বে শহরের বাড়িওয়ালা, ভাড়াটিয়া ও অন্যান্য অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, লিখিত চুক্তি, নোটিশ প্রদানের নিয়মাবলী, উভয় পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে সংস্থার আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপ সচিব) জিয়াউর রহমান বলেন, দেশে বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত মূল আইন হলো ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’। এই আইনের মাধ্যমে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার অধিকার, দায়িত্ব এবং আইনগত সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইনের ধারাগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার মধ্যে বিরোধ কমবে এবং উভয় পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত হবে।’
১. নিয়োগ ও কার্যাবলি: ধারা ২(ক), ৩ ও ১৫ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক বাড়ি-মালিক ও ভাড়াটিয়ার আবেদনের ভিত্তিতে মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ, অনুমতি ছাড়া ভাড়া বৃদ্ধি রোধ এবং অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা সালামি দাবির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন।
২. ভাড়ার নির্ধারণ ও চুক্তি: ধারা ৭ অনুযায়ী চুক্তি সম্পূর্ণ হওয়া বা নিয়ন্ত্রকের অনুমতি ছাড়া ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না। ধারা ১৫ অনুযায়ী বাড়ির বাজার মূল্যের বার্ষিক ১৫% পর্যন্ত মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
৩. উচ্ছেদ ও অধিকার: ধারা ১৮, ১৯, ২১ অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে অবৈধ উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় মেরামত ও পরিষেবা নিশ্চিতকরণ, এবং ভাড়া জমার ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া মেনে চলার সুযোগ রয়েছে।
ভাড়াটিয়ার লিখিত ভাড়াচুক্তির অধিকার রয়েছে, যাতে ভাড়া, মেয়াদ, জামানত ও মেরামতের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। তারা অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকবেন এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদ থেকে রক্ষা পাবেন। এছাড়া মৌলিক সুবিধা যেমন পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা বজায় রাখার দাবি করার অধিকার এবং নিরাপদ জামানত নীতি অনুসরণের অধিকার তাদের রয়েছে।
বাড়িওয়ালা নির্ধারিত সময়ে ভাড়া গ্রহণের আইনগত অধিকার রাখেন। সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন। চুক্তি মেয়াদ শেষে বাড়ি পুনর্নিরীক্ষণ ও অধিগ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়া ভাড়াটিয়া চুক্তি লঙ্ঘন বা অতিরিক্ত ব্যবহার করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের থাকবে।
ধারা ১৫ অনুযায়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ সীমিত। ঢাকায় অনেক ভাড়া মৌখিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা আইনি নিরাপত্তা কমায়। নিয়ন্ত্রক পর্যায়ের কার্যক্রম যথেষ্ট সক্রিয় বা স্বাধীন নয়। বিরোধ নিষ্পত্তি ধীরগতি এবং আদালত নির্ভর। জামানত ও ভাড়া বৃদ্ধিতে স্বচ্ছতার অভাবও লক্ষ্য করা গেছে।
ডিএনসিসি ভাড়া রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম চালু করতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড ভাড়াচুক্তি ফরম প্রণয়ন করা যেতে পারে। ভাড়া সংক্রান্ত অভিযোগ সেল ও মধ্যস্থতা বোর্ড স্থাপন করা যাবে। বার্ষিক ভাড়া বৃদ্ধির নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে। আইনগত সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ও কর্মশালা পরিচালনা করা হবে। স্থানীয় স্তরে বিরোধ নিষ্পত্তি বোর্ড গঠন করা সম্ভব।
সকল ভাড়াবাড়িতে বাধ্যতামূলক লিখিত চুক্তি ব্যবহার করা উচিত। ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতি অনুসরণ করতে হবে এবং আগাম লিখিত নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক। ন্যায্য ও নিয়ন্ত্রিত জামানত নীতি মানা হবে। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ন্যায়সঙ্গত হতে হবে। নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ভাড়া নিবন্ধন ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় বোর্ড কার্যকর করতে হবে। ভাড়াটিয়ার তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইউটিলিটি বিল এবং জরুরি অবস্থায় সহযোগিতা থাকবে।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ঢাকার ভাড়াবাজার আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল হবে।
এএইচ/ক.ম