images

জাতীয়

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি: ৩০ বছর পর ফিরে দেখা এক নারকীয় রাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ আগস্ট ২০২৫, ০৮:৪৪ পিএম

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। দিনাজপুরবাসীর কাছে শুধুই একটি ঘটনা নয়, বরং এক গভীর ক্ষত। সে সময় কিশোরী ইয়াসমিন আক্তারের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নগ্ন রূপই দেখায়নি, দেখিয়েছে জনতার রুদ্ধশ্বাস প্রতিরোধ কতটা বিস্ফোরক হতে পারে।

ইয়াসমিনের মৃত্যু ডেকে আনা রাতের যাত্রা

ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ শেষে ১৪ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন যাত্রা করেন দিনাজপুরের পথে। বাস থেকে নামেন ভোরে, দিনাজপুর শহরের অদূরে দশমাইল মোড়ে। নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্য বাসের অপেক্ষায়। তখন টহলরত পুলিশের একটি ভ্যান এসে দাঁড়ায় তার সামনে। পুলিশ কিছুক্ষণ তাকে জেরা করে৷ তারপর সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। তিন সদস্যের পুলিশি টহল দলে ছিলেন একজন এএসআই, একজন কনস্টেবল এবং একজন চালক। তারা অনেকটা জোর করেই ভ্যানে তোলেন ইয়াসমিনকে। এসময় উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় লোকজন ইয়াসমিনকে পরামর্শ দেন, পুলিশের সঙ্গে যাওয়ার। ইয়াসমিনও ভরসা পেলেন। উঠলেন পুলিশ ভ্যানে। কিন্তু এরপর শুরু হয় বিভীষিকাময় অধ্যায়।

পুলিশ ভ্যানে গণধর্ষণ ও হত্যা

পুলিশ সদস্যরা ইয়াসমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে গণধর্ষণ করে এবং পরে শ্বাসরোধে হত্যা করে। তার মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় রাস্তার পাশে। পরদিন সকালে পথচারীরা লাশটি দেখতে পান এবং খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে পুলিশ বিষয়টি ‘অজানা মরদেহ’ বলে চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়।

পত্রিকা প্রতিবেদন: ঘটনার মোড় ঘুরে যায়

স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল ঘটনাটি জানিয়ে দেন ‘উত্তরবাংলা’ পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানকে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দিতে পুলিশ বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয় পত্রিকা অফিসের। মতিউর রহমান ও তার দল হাল ছাড়েনি—বিদ্যুৎ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপান। ২৬ আগস্ট প্রকাশিত হয় সেই ভয়ংকর সত্য।

BBB
প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশ। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবাদের আগুন

সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই ফেটে পড়ে দিনাজপুরবাসী। মানুষ রাস্তায় নামে, হাজার হাজার। বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় হামলা চালায়, সরকারি দপ্তর ভাঙচুর করে। প্রেস ক্লাবেও আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ ব্যারিকেড দেয়, কিন্তু বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের জেলাগুলোতেও।

২৭ আগস্ট, প্রতিবাদ আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। পুলিশের গুলিতে ৭ জন নিহত হয়, আহত হয় অন্তত ৩০০ জন। সরকার কারফিউ জারি করে, বদলি করা হয় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে। শহরে মোতায়েন হয় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি)।তবুও জনতা থামেনি।

অপপ্রচার ও রাজনীতি

ঘটনাটিকে প্রথমে ‘ছোটখাটো গোলমাল’ হিসেবে তুলে ধরতে চায় সরকার। অভিযোগ ওঠে, ইয়াসমিনকে ‘পতিতা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল প্রশাসন। এমনকি আরেকজন যৌনকর্মীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ইয়াসমিন হিসেবে সাজানোর চেষ্টা হয়েছিল—যাতে প্রমাণ বিকৃত হয়। এসব অপচেষ্টায় মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিদেশে নারী সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত দিনাজপুরে ছুটে যান। তিনি নিহত ইয়াসমিনের পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং পুরো ঘটনায় বিচার দাবি করেন।

বিচার ও মৃত্যুদণ্ড

ঘটনার তদন্তে তিন পুলিশ সদস্য—এএসআই মইনুল হক, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার, ও চালক অমৃতলালকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট, আদালত তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে রায় কার্যকর হতে সময় লেগে যায় আরও সাড়ে সাত বছর। অর্থাৎ, ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফাঁসি কার্যকর হয় মইনুল ও সাত্তারের। কিন্তু ২৯ সেপ্টেম্বর, অমৃতলালও ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুবরণ করেন।

TT
সেই ট্রাজেডিও আজও স্মরণ করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

জনতার প্রতিরোধ—এক শিক্ষা

তখন দিনাজপুর, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষ দল-মত নির্বিশেষে একত্রিত হয়েছিল। নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় এমন সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়া আগে দেখা যায়নি। নিহত ৭ জনের পরিবার আজও শোক বয়ে বেড়ায়।

আহত মাসুদ রানা একজন প্রতিবাদকারী। এখনো শরীরে বুলেটের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। ৯ মাস ছিলেন হাসপাতালে, এখনো সরকারি কোনো সহায়তা পাননি।

আজও সেই প্রশ্ন: এ কবে থামবে?

আজ ৩০ বছর পর, ইয়াসমিন নেই। কিন্তু তার নামেই গড়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা। দিনাজপুরে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ (২০১২ সালে)। সেই থেকে ২৪ আগস্ট পালিত হয় ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দিনটি ঘিরে চলে আলোচনা সভা, দোয়া ও কালো ব্যাজ ধারণ।

এইউ