images

জাতীয়

তামাক থেকে আয়ের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি ব্যয় চিকিৎসায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৯:৪৬ পিএম

বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান খাত তামাক। প্রতিবছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট রাজস্ব আহরণের একটা বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। তবে তামাক খাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করে তার থেকে ৩৪ শতাংশ বেশি খরচ হয় তামাকের কারণে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা বাবদ। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তামাক-কর ও কার্যকর মূল্য বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তরুণ সমাজের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট জনেরা।

সোমবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে, তামাকপণ্যের কার্যকর করারোপের দাবিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন এর আয়োজনে ইয়ুথ কনফারেন্সে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, প্রতিবছর তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে এবং বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। এছাড়া তামাক খাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে তার থেকে ৩৪ শতাংশের বেশি খরচ হয় তামাকের কারণে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা বাবদ।

এ অবস্থায় দেশে তামাক ব্যবহার হ্রাস ও ক্ষয়ক্ষতি নিরসনে সভায় আগামী ২০২৫-২৬ অর্থ-বছরের বাজেটে তামাক-কর ও দাম বৃদ্ধির জন্য যেসব দাবি করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো- সিগারেটের বর্তমান চারটি স্তরকে কমিয়ে তিনটি স্তরে নামিয়ে আনা অর্থাৎ নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে একটি স্তর করা এবং এ স্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের সর্বনিম্ন মূল্য ৮০ টাকা নির্ধারণ করা; এছাড়াও সকল স্তরের সিগারেটের সম্পূরক শুল্ক ৬৭ শতাংশ করার দাবি করা হয়। এছাড়া উচ্চ স্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের সর্বনিম্ন মূল্য ১৩০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের সর্বনিম্ন মূল্য ১৮০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এতে আরও জানানো হয়- উল্লেখিত তামাক-কর ও দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ১৬ লাখ অকালমৃত্যু রোধ করা যাবে। একইসঙ্গে  প্রায় ১৬ লাখ তরুণকে ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখা যাবে। প্রায় ২৩ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে এবং ২০২৫-২৬ অর্থ-বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরিত হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের কর্মসূচি পরিচালক শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা হ্রাস করতে মূল্যস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ ও তা নিয়মিতভাবে বৃদ্ধি করতে হবে; সিগারেটের মূল্য স্তরগুলোর মধ্যে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য ব্যবধান কমিয়ে আনার মাধ্যমে সিগারেট ব্যবহারকারীর মূল্য স্তর পরিবর্তন করে কম মূল্য স্তরের সিগারেট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করতে হবে; পর্যায়ক্রমে একক মূল্যস্তর পদ্ধতির প্রচলন করতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি, যার সাথে রয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। আমরা অফিসিয়াল চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছি যেন নাটক-সিনেমায় তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি যেন পাঠ্যপুস্তকে তামাকবিরোধী তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর হার বৃদ্ধি করে এটিকে মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে নেওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায়। কিশোর-তরুণদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তামাকপণ্যের উচ্চমূল্য কিশোর-তরুণদের তামাক ব্যবহার থেকে বিরত রাখবে। গবেষণায় দেখা যায়, ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশে এর ব্যবহার কমবে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ।

তিনি আরও বলেন, একক শলাকার মূল্যে খুচরা পয়সা থাকলে বিক্রেতারা খুচরা অংশটুকু বাড়িয়ে নিয়ে পূর্ণ টাকায় বিক্রি করে। এতে তামাক ব্যবহারকারীরা বেশি দামে কিনলেও, বর্ধিত মূল্য থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পায় না; কিন্তু ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধি পায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য ড. মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে কর বৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্য অত্যন্ত সস্তা ও সহজলভ্য এবং তামাক কর কাঠামো ত্রুটিপূর্ণ। এতে করে তরুণ ছেলেমেয়েদের তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা যাচ্ছে না। তামাক ব্যবহারজনিত মৃত্যু ও অসুস্থতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের স্বাস্থ্য ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, মূল্যস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে সব ধরনের সিগারেটের দাম বৃদ্ধি, নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক খুচরা মূল্যের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ করা এবং সিগারেটে বহুস্তর বিশিষ্ট আ্যডভ্যালোরেম কর পদ্ধতির পরিবর্তে ইউনিফর্ম স্পেসিফিক বা মিক্সড (স্পেসিফিক ও আ্যডভ্যালোরেম) কর পদ্ধতি প্রচলনের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকেও এর প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।  

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আরিফ আহমেদ বলেন, সুস্থ-সমৃদ্ধ দেশের জন্য ধূমপানমুক্ত সমাজ দরকার। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে তামাকজাত পণ্যের কর এবং দাম বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তামাক সেবনের ফলে প্রতিবছর ৮ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে সরাসরি তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যায় ৭১ লাখ মানুষ এবং পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মারা যায় প্রায় ৯ লাখ মানুষ। অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৩-১৫ বছরের শিশুদের মধ্যে (গ্লোবাল ইয়ুথ ট্যোবাকো সার্ভে-২০১৩) শতকরা ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যাবহার করে। তাদের মধ্যে ছেলেদের সংখ্যা ৯ দশমিক ২০ শতাংশ এবং মেয়েদের সংখ্যা ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এই শতকরার পরিমাণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। তামাকপণ্যের অতিরিক্ত কর বাড়িয়ে এই লক্ষ্যে আমরা অচিরেই পৌঁছাতে পারি। তাই আমি বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তামাকপণ্যের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

অ্যান্টি টোব্যাকো ক্লাবের ইয়ুথ লিডার গোলাম মোরশেদ বলেন, তামাক ব্যবহারের ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, সিওপিডি বা ফুসফুসের ক্যান্সার হবার ঝুঁকি ৫৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ধরনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ১০৯ শতাংশ বেড়ে যায়। তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে এবং আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধি এবং এর দাম বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প পথ আমাদের হাতে খোলা নেই।

এমএইচ/এফএ