images

জাতীয়

অভিনব কৌশলে তৎপর মাদক কারবারিরা, দুই নারীসহ গ্রেফতার ৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ জুলাই ২০২৩, ০২:৫৪ পিএম

অভিনব কৌশলে তৎপর রয়েছে মাদক কারবার চক্রের সদস্যরা। তবে চা বিক্রেতার ছদ্মবেশ ধারণ করে একটি ইয়াবা সিন্ডিকেটের মূলহোতাসহ ৫ জন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ৪১ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) ঢাকা মেট্রো. কার্যালয়ে (উত্তর) সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পৃথক তিনটি অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতাররা হলেন— সাধন তনচংগ্যা (২৫), ফাতেমা (৩৫), মোছা. মমিনা বেগম (২০), মো. ইয়াকুব আলী (৪০) ও মো. নাঈম (২৪)। তাদের মধ্যে সাধন তনচংগ্যাকে চা বিক্রেতা সেজে গ্রেফতার করা হয়।

চা বিক্রেতার ছদ্মবেশ ধারণ করে যেভাবে গ্রেফতার করা হয়:

ইতোপূর্বে উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের কয়েকটি মাদক কারবারিদের মাদকের চালান ঢাকায় আটক করলে ওই সিন্ডিকেটের মাদক কারবারিরা ডিএনসির অভিযানের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে। মাদক বা ইয়াবা লেনদেনের পূর্বে মাদক কারবারিদের ৪-৫ জনের একটি দল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের ক্লিয়ারেন্সের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মাদকের লেনদেন সম্পন্ন করে। তাদের এই তৎপরতা সম্পর্কে অবগত হয় মাদক দ্রব্য দফতরের কর্মকর্তারা।

এক পর্যায়ে তাদের কাছে তথ্য আসে যে দারুস সালাম থানাধীন গাবতলী এলাকায় এ চরের বিপুল ইয়াবার একটি চালানের লেনদেন হবে। এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে ওই স্থানে ডিএনসির ঢাকা মেট্রো কার্যালয় (উত্তর) এর চৌকশ কর্মকর্তাগণ চা বিক্রেতার ছদ্মবেশে সেখানে অবস্থান নেয়। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সকাল ১১টার দিকে রাঙ্গামাটি হয়ে উত্তরবঙ্গের মাদক চোরাকারবারীর অন্যতম সদস্য সাধন তনচংগ্যাকে (২৫) মহিলাদের পেটিকোটের ভিতরে বিশেষভাবে তৈরি পকেটে ১১ হাজার পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর আসামি জানায়, টেকনাফ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে প্রথমে রাঙ্গামাটি নিয়ে যায়। সেখান থেকে একটি পরিবহনযোগে গাবতলী এলাকায় অবস্থানরত উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের মাদক কারবারির কাছে সরবরাহ করে।

নৌপথে চাঁদপুর হয়ে ঢাকায় ইয়াবা চোরাচালান:

ঢাকার প্রবেশমুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ডিএনসির নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় মাদক কাববারিরা ঢাকায় মাদক চোরাচালানের নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে। টেকনাফের একটি মাদকচক্র প্রথমে চাঁদপুর জেলায় অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী ও চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখান থেকে নৌপথে লঞ্চযোগে ঢাকায় মাদক চোরাচালান করে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে চক্রের দুই জন মহিলা সদস্য চাঁদপুর থেকে লঞ্চযোগে মাদকের একটি চালান নিয়ে সদরঘাট এলাকায় আসার খবর পায়। ডিএনসির অপর একটি টিম ওই স্থানে অভিযান পরিচালনা করে ফাতেমা (৩৫) ও মোছা. মমিনা বেগমকে (২০) ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। তাদের দুজনের বাড়ি টেকনাফে।

আইনশৃঙ্খলা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে টেকনাফ থেকে প্রথমে ইয়াবার চালান চাঁদপুর অবস্থান করে এবং পরবর্তীতে পঞ্চাযোগে ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে আসে। তারা বাড়তি সর্তকর্তা হিসেবে লাগেজের ভিতরে বিশেষ কৌশলে চেম্বার করে লুকিয়ে ইয়াবা পরিবহন করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা একই পদ্ধতি অবলম্বন করে একাধিক ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে এসেছে।

ট্রাভেলারের ছদ্মবেশে মোটরসাইকেল যোগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ইয়াবা চোরাচালান:

মাদকদ্রব্য কর্মকর্তারা জানান, রংপুর কেন্দ্রীক কুখ্যাত মাদক কারবারিরা মিরপুরের কালশি এলাকা দিয়ে দীর্ঘদিন ঢাকার মিরপুর ও উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে ইয়াবা সরবরাহ করে আসছে। তার মাদক চোরাচালানের কৌশল একটু ভিন্ন ধরনের।

টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে মাদকদ্রব্য সংগ্রহ ও পরিবহন করে একাধিক মাদক মামলার আসামি মো. ইয়াকুব আলী (৪০) করে ঢাকায় নিয়ে আসে। প্রথমে টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অবস্থান করে স্থানীয় মাদক কারবারিদের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে হোটেলে অবস্থান করে মজুদ করে। পরবর্তীতে ইয়াবার বড় চালান বিভিন্ন কৌশলে সে ঢাকায় নিয়ে আসে। এ জন্য তার রয়েছে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল। তার সহযোগীরা প্রাইভেটকার যোগে প্রথমে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করে তাদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর মোটরসাইকেলযোগে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে।

মোটরসাইকেলে আরোহন অবস্থায় সে ট্রাভেলারের বেশভূষা ধারণ করে, যাতে সহজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে ইতোপূর্বে সে বেশ কয়েকটি ইয়াবার চালান নিয়ে আসে বলে আমাদের কাছে তথ্য ছিল। এসব তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে আমরা দীর্ঘদিন তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি এবং সর্বশেষ জানতে পারি কক্সবাজার থেকে বিপুল ইয়াবার একটি চালান নিয়ে ঢাকার মিরপুর, কালশী এলাকায় আসবে। ওই তথ্য মোতাবেক ডিএনসির ঢাকা মেট্রো কার্যালয় (উত্তর) এর রমনা ও গুলশান সার্কেল এর সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকশ টিম নিয়ে গতকাল বিকেলে কালশী এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। মোটরসাইকেল যোগে ওই স্থানে আসলে ২৫ হাজার পিস ইয়াবা ও মোটরসাইকেলসহ কুখ্যাত মাদক কারবারি মো. ইয়াকুব আলীকে (৪০) গ্রেফতার করা হয়। 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, সে কক্সবাজারে অবস্থান করে স্থানীয় মাদক কারবারি থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে মোটরসাইকেল যোগে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং এ ইয়াবার চালান পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে রংপুরে নিয়ে যেত। তার বিরুদ্ধে পূর্বে বিভিন্ন সময়ে ৭টি মাদক মামলা রয়েছে।

অপরদিকে একই দিন সকালে তেজগাঁও সার্কেলের অপর একটি টিম ফার্মগেট এলাকা থেকে অপর একজন মাদক করাবারি নাঈমকে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার আসামিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত ২০২০) মোতাবেক সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এ ধরণের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

কেআর/এএস