Dhaka Mail Logo

জাতীয়

বাড়ছে পুলিশের চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৬ জুন ২০২৩, ০৯:৪৩ পিএম

নিয়মিত কাজের বাইরে গত কয়েক বছরে বিভিন্নভাবে দায়িত্বের পরিধি বেড়েছে পুলিশের। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি সামাল দিতেই তাদের ঘাম ছুটছে। ফলে অনেক সময় হামলারও শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। আর এতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং চ্যালেঞ্জ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু মাঠে-ঘাটেই নয়, সাইবার জগতেও পুলিশকে চোখ-কান খোলা রেখে কাজ করতে হচ্ছে। কারণ গত কয়েক বছরে সাইবার অপরাধ অনেক বেড়েছে। বেড়েছে প্রতারণা ও অপরাধের ধরনও। এসব সামাল দিতে নতুনভাবে তৈরি হতে হচ্ছে পুলিশকে। সাইবার অপরাধ ও ঝুঁকি মোকাবেলায় তাদের দক্ষ হতে প্রশিক্ষণও নিতে হচ্ছে।

আগে পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার পাশাপাশি বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে কাজে লাগানো হতো। কিন্তু ইদানীং জরুরি সেবা ৯৯৯, সাইবার সেবা ও নারী শিশু হেল্প লাইন থেকে আসা কলেও ছুটে যেতে হচ্ছে। পুলিশকে জনমুখী সেবায় সম্পৃক্ত করতে গিয়ে এবং নানা সেবা চালু হওয়ায় নিয়মিত ডিউটির পাশাপাশি কাজ যেমন বেড়েছে তেমনি পরিশ্রম ও ডিউটির সময়ও বাড়ছে। বাড়তি কাজ করতে গিয়ে তাদের মাঝে অবসাদ ও হতাশা চলে আসছে। এর ফলে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। এছাড়া ঢাকা নগরীতে অনুমতি ছাড়া মিছিল-মিটিং করলে তা প্রতিহত করার মতো কাজও তাদের করতে হচ্ছে। এসব অভিযানে গিয়ে হামলার শিকারও হতে হচ্ছে।Policeগত ৮ জুন রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় শত বছরের পুরোনো ডিআইটি পুকুর ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের খবর পেয়ে রাজউকের ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে যায় এবং অভিযান শেষে ফেরার সময় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করে পুকুর দখলকারীর লোকজন। গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবাজারে আগুনের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও কাজে বাধা দেওয়া হয়। ৬ জুন বগুড়ার গাবতলীতে খোকন চন্দ্র (৩২) নামে এক মাদক কারবারির স্বজনরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। একই দিন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার ঘটনা ঘটে।

গেল বছরের ৬ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে নির্বাচনে হেরে বিজয়ী প্রার্থীর বাড়িতে হামলার সময় বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলা হয়। জেলার সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের হোসেনডাঙ্গা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালের ২৯ জানুয়ারি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেফতারের সময় পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি একটি মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি কাজী পাভেলকে ধরতে ঘাটুরা গ্রামে তার বাড়িতে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নাজমুল আলম ও একদল পুলিশ। এ সময় কাজী পাভেলের পরিবারের সদস্যসহ কাজী বাড়ির লোকজন পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

সরকারি কাজে গিয়ে পুলিশ বাধা ও হামলার শিকার হচ্ছে অহরহ। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনেও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক বছরে শতাধিক এমন ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা শুধু আহতই হননি, অনেকে হামলার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কেউ কেউ মারাও গেছেন। যদিও সেই পরিসংখ্যান দিতে পারেনি পুলিশ সদর দফতর।Policeচলতি বছরের শেষে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন। কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে সেটা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলো মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দলের আন্দোলন জোরদার হলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশের ওপর দায়িত্ব পড়বে তা দমনের। এতে আগামী কয়েকটি মাস পুলিশের জন্য হবে চ্যালেঞ্জিং।

গত ছয় মাস আগে পুলিশে যোগদানকারী এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের ডিউটি এখন আট ঘণ্টা সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো তা ১২ ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সকালে বের হয়েছি নয়টা। রাতে ১১টায়ও পৌঁছাতে পারব কি না জানি না।

ঢাকা শহরে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি বিক্ষোভ ও সমাবেশের মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘাম ছুটছে পুলিশের। এর ফলে বেশির ভাগ পুলিশ সদস্য ছুটিতে যেতে পারছেন না। হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

সামনে পুলিশের চ্যালেঞ্জ আছে কি না আর থাকলে পুলিশ কীভাবে কাজ করবে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশের ওপর হামলার মতো ঝামেলা হয়। তবে আমরা এগুলো মাথায় রেখেই কাজ করি। আমরা সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ আসবে জানি না, তবে যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জই আসুক না কেন সেটা ঢাকা মহানগর পুলিশ তার সামর্থ্য অনুযায়ী মোকাবেলা করবে।’Policeএদিকে, পুলিশের কাজের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইতোমধ্যে নানা সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসআই পদে নিয়োগ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, কিন্তু এর মধ্যেই এএসআই ও কনস্টেবল পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। একদিনে পুলিশ তাদের জনবলের বহর বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশকে আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য বাড়ানো হয়েছে বাজেট।

নির্বাচনের বছরে পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন খোদ সংস্থাটির প্রধান আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগামীতে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। আইনশৃঙ্খলার যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে। এজন্য পুলিশের প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ এবং পুলিশ সদস্যদের দৃঢ় মনোবল রয়েছে।

সামনে নির্বাচনে পুলিশের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে পুলিশপ্রধান বলেন, নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের অধীনে পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যা যা করা প্রয়োজন পুলিশ তাই করবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। 

এমআইকে/জেবি