Dhaka Mail Logo

লাইফস্টাইল

ভার্চুয়াল উচ্ছ্বাস বনাম বাস্তবের বাবা

লাইফস্টাইল ডেস্ক

২১ জুন ২০২৬, ১০:৩০ এএম

প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বাবা দিবস। দিনটি এলেই সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম হয়ে ওঠে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে ভেসে বেড়ায় আবেগমাখা পোস্ট, রঙিন গ্রাফিক্স আর পুরনো ছবির কোলাজ। 'বাবা, তুমি আমার অনুপ্রেরণা', 'তোমার মতো কেউ নেই' এ ধরনের কথাগুলো মুহূর্তের মধ্যে হাজারো লাইক আর শেয়ার পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভালোবাসার উচ্ছ্বাস কি কেবল একটি দিনের আবেগ? নাকি এর পেছনে আছে গভীর কোনো উপলব্ধি ও দায়বদ্ধতা? বাস্তবতা অনেক সময়ই ভিন্ন কথা বলে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন বাবাকে নিয়ে পোস্টের বন্যা বয়, ঠিক তখন হয়তো দেশের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে কিংবা শহরের নিভৃত কোণে এক বৃদ্ধ বাবা একা বসে আছেন। সন্তান শহরে থাকে, নিজের ব্যস্ত জীবনে। হয়তো বাবা দিবসে একটা শুভেচ্ছা বার্তা আসবে, কিন্তু সন্তানের মুখ দেখা হবে না, সরাসরি কণ্ঠস্বর শোনা হবে না। সারা দিন অপেক্ষায় থেকে রাতে হয়তো তিনি একাই ঘুমিয়ে পড়বেন। 

ভার্চুয়াল জগতের এই উচ্ছ্বাস আর বাস্তবের নিঃসঙ্গতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এমন লক্ষ লক্ষ বাবা। তাদের কথা কেউ পোস্ট করে না, তাদের একাকীত্বের কোনো ছবিও ভাইরাল হয় না।

বাবা সারা জীবন পরিবারের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেন একেবারে নিঃশব্দে। ভোরবেলা সবার আগে ওঠেন, রাতে সবার পরে ঘুমান। মাসের শেষে টানাটানি হলে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেন, কিন্তু সন্তানের পড়াশোনার খরচ ঠিকই জুগিয়ে যান। সংসারের অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে গিয়ে তাদের নিজস্ব স্বপ্ন, শখ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সবকিছু পেছনে পড়ে যায়। 

কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না, তার কেমন লাগছে। কেউ ভাবে না, পারিবারিক প্রত্যাশার ভার বইতে গিয়ে বাবার ভেতরে কী জমে উঠছে। তিনি কি কখনো কাঁদেন? তার কি কোনো আক্ষেপ আছে? এই প্রশ্নগুলো আমরা সাধারণত করি না। কারণ বাবাকে আমরা রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে নয়, বরং কেবল একটি 'ভূমিকা' হিসেবে দেখতেই বেশি অভ্যস্ত।

বাবা দিবসকে কেন্দ্র করে এখন গড়ে ওঠে বিশাল বাণিজ্যিক আয়োজন। বিজ্ঞাপনে আবেগের ঢল নামে, উপহারের দোকানে থাকে উপচে পড়া ভিড়। একটি দামি উপহার কিনলেই যেন মনে হয় দায়িত্ব পালন হয়ে গেল। কিন্তু বাবা কি আসলে সেই উপহার চান? তিনি হয়তো চান সন্তান কাছে আসুক, পাশে বসুক, তার জীবনের না-বলা গল্পগুলো একবার মনোযোগ দিয়ে শুনুক। এই সামান্য চাওয়াটুকু পূরণ করার জন্য কোনো বিশেষ দিন বা দামি উপহারের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটু সময় আর আন্তরিক উপস্থিতি।

এসব উদযাপনের মাঝে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের বাবা আর পৃথিবীতে নেই। সামাজিক মাধ্যমের প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি উৎসবমুখর স্ট্যাটাস তাদের বুকে নতুন করে ব্যথা জাগায়। জীবনের প্রতিটি অর্জনে, পরীক্ষার ফলাফল থেকে শুরু করে নিজের সন্তানের মুখ দেখা পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তেই তারা অনুভব করেন এক অপূরণীয় শূন্যতা। বাবার রেখে যাওয়া কথাগুলো আর শেখানো মূল্যবোধগুলোই তারা বুকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন।

বাবা দিবস কেবল কোনো পোস্ট বা ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগের বিষয় নয়, কোনো বিশেষ আয়োজনের উপলক্ষও নয়। এটি মূলত আত্মজিজ্ঞাসার একটি সুযোগ। আমরা কি সত্যিই বাবার পাশে আছি? তার সুখ-দুঃখের খবর রাখি? তাকে যথেষ্ট সময় ও সম্মান দিচ্ছি? তার মনের কথা কি কখনো জানতে চেয়েছি? একটি পোস্ট নয়, একটি ফোন কল হোক। 

একটি দামি উপহার নয়, একটু নিবিড় সময় কাটানো হোক। এটুকুই হোক এবারের বাবা দিবসের সত্যিকারের প্রতিশ্রুতি। কারণ ভালোবাসা কখনো স্ক্রিনের আলোয় প্রমাণ হয় না, প্রমাণ হয় উপস্থিতিতে, স্পর্শে আর আন্তরিক সময়ে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইম্পেরিয়াম ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, মালয়েশিয়া

এনএম