লাইফস্টাইল ডেস্ক
১৫ জুন ২০২৬, ১২:২১ পিএম
মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক আসে, যা সুখের চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। কেউ বারবার অপমান করে, কেউ মানসিক চাপ তৈরি করে, আবার কেউ সম্পর্ককে জটিল ও অস্থির করে তোলে। তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন মানুষদের অনেক সময় আমাদের খুব পরিচিত মনে হয়। যেন আগে কোথাও দেখেছি, আগে কখনো এমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছি।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এর পেছনে রয়েছে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা, মানসিক গঠন এবং মস্তিষ্কের কিছু স্বাভাবিক প্রবণতা। বিষাক্ত মানুষকে ভালো লাগার কারণ তারা ভালো, তা নয়; বরং তাদের আচরণের সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক পুরনো। কেন এমন হয়, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
শৈশব থেকেই আমরা সম্পর্কের একটি ধারণা তৈরি করি। পরিবার, বন্ধু বা ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে আমরা শিখি মানুষ কীভাবে ভালোবাসে, কীভাবে আচরণ করে। যদি কেউ এমন পরিবেশে বড় হয়ে থাকে যেখানে সমালোচনা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, অথবা পরিবারের সদস্যদের আচরণ ছিল অস্থির ও অনিশ্চিত, তাহলে সে অবচেতনভাবে সেই ধরনের সম্পর্ককেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে।

ফলে পরবর্তী জীবনে যখন কারও মধ্যে একই ধরনের আচরণ দেখা যায়, তখন মস্তিষ্ক সেটিকে সহজেই চিনে ফেলে। মনে হয়, “এ তো পরিচিত।” কিন্তু পরিচিত হওয়া আর সুস্থ হওয়া এক বিষয় নয়। অনেক সময় যা পরিচিত লাগে, তা কেবল অতীতে টিকে থাকার অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি।
মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা রয়েছে, যাকে বলা হয় “মিয়ার-এক্সপোজার ইফেক্ট”। সহজ ভাষায়, কোনো কিছু যত বেশি দেখা বা অনুভব করা হয়, সেটি তত বেশি স্বাভাবিক ও নিরাপদ মনে হয়। এই কারণেই অনেক সময় স্থিতিশীল, ভদ্র ও সম্মানজনক মানুষকে আমাদের কাছে প্রথমে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। সম্পর্কটিতে নাটক নেই, টানাপোড়েন নেই, অস্থিরতা নেই। ফলে সেটি উত্তেজনাহীন বলে মনে হতে পারে।
অন্যদিকে, অনিশ্চয়তা বা মানসিক দূরত্ব তৈরি করে এমন কাউকে দেখলে মনে হয়, “এটাই তো চেনা।” অথচ সেই চেনা অনুভূতি আসলে সামঞ্জস্যের নয়, শুধুই পরিচিতির।

অনেক সময় মানুষ অবচেতনভাবে সেই অভিজ্ঞতার কাছেই ফিরে যায়, যা তাকে একসময় কষ্ট দিয়েছিল। কারণ মনের গভীরে একটি আশা কাজ করে, এবার হয়তো গল্পটা অন্যরকম হবে। ধরা যাক, শৈশবে কেউ পর্যাপ্ত স্নেহ পায়নি বা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। পরবর্তীতে সে হয়তো এমন মানুষদের প্রতিই আকৃষ্ট হবে, যারা আবেগগতভাবে দূরত্ব বজায় রাখে।
মনের ভেতর তখন একটি অদৃশ্য আকাঙ্ক্ষা কাজ করে—“এই মানুষটিকে যদি বদলাতে পারি, যদি তার ভালোবাসা পেতে পারি, তাহলে হয়তো পুরনো কষ্টটাও মুছে যাবে।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিষাক্ত সম্পর্ক পুরনো ক্ষত সারায় না। বরং সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে তোলে। সুস্থতা আসে সমস্যাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার মাধ্যমে নয়, বরং সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যমে।
বিষাক্ত সম্পর্ক সবসময় খারাপ থাকে না। বরং এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, ভালো ও খারাপ আচরণের মিশ্রণ। একদিন প্রচণ্ড যত্ন, পরের দিন সম্পূর্ণ উদাসীনতা। কখনো প্রশংসা, কখনো অবহেলা। এই ওঠানামা মানুষের মনে তীব্র আবেগ তৈরি করে।

তখন মানুষ সম্পর্কটির ভালো মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে চায়। সে অপেক্ষা করে, আবার হয়তো আগের মতো সুন্দর সময় ফিরে আসবে। কিন্তু এই অপেক্ষা ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক আসক্তিতে পরিণত হয়। ভালোবাসার অনুভূতি মনে হলেও, বাস্তবে এটি অনেক সময় অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার এক অন্তহীন চক্র।
অনেকেই ছোটবেলা থেকেই অন্যের মন রক্ষার জন্য নিজের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিতে শেখেন না। সব সময় মানিয়ে নেওয়া, সহ্য করা এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য।
এর ফলে পরবর্তীতে কেউ অসম্মানজনক আচরণ করলেও সেটি বড় কোনো সতর্ক সংকেত হিসেবে ধরা পড়ে না। বরং পরিচিত এক অভিজ্ঞতা বলে মনে হয়। যখন আত্মসম্মানের চেয়ে সহ্য করার ক্ষমতাকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়, তখন ব্যক্তিগত সীমারেখাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বিষাক্ত আচরণও অনেক সময় স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে।

আমরা প্রায়ই পরিচিত অনুভূতিকে নিরাপত্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু কোনো কিছু পরিচিত মনে হওয়ার অর্থ কেবল এটুকুই যে আমরা আগে সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। সেটি সুখকরও হতে পারে, আবার ক্ষতিকরও হতে পারে।
তাই জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পরিচিত জিনিসের পেছনে ছোটা নয়, বরং সচেতনভাবে নির্বাচন করা। কোন সম্পর্ক আমাকে সম্মান দেয়, কোন সম্পর্ক আমাকে মানসিক শান্তি দেয়, কোন মানুষটির সঙ্গে আমি নিরাপদ বোধ করি—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা।
বিষাক্ত মানুষ পরিচিত লাগতেই পারে। কারণ মস্তিষ্ক সেই পুরনো ছক চিনে ফেলে। কিন্তু সেই পরিচিতির কাছে আত্মসমর্পণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
মানুষ চাইলে নতুন পথ বেছে নিতে পারে। এমন সম্পর্ক বেছে নিতে পারে যেখানে সম্মান আছে, স্থিরতা আছে, আন্তরিকতা আছে। প্রথমে হয়তো তা অচেনা লাগবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সত্যিকারের আপন ঠিকানা। কারণ সুস্থ সম্পর্কের পরিচিতি কষ্ট দেয় না, বরং ধীরে ধীরে মানুষকে নিরাময় করে।
এনএম