লাইফস্টাইল প্রতিবেদক
০৪ জুন ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
ব্রেইন স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যায়, যাকে আমরা সাধারণভাবে প্যারালাইসিস বলে থাকি। এমন পরিস্থিতিতে রোগী ও পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই মনে করেন যে হয়তো আর কখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করা সম্ভব হবে না। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়। আধুনিক চিকিৎসা, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এবং সঠিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক রোগীই ধীরে ধীরে তাদের হারিয়ে যাওয়া সক্ষমতার একটি বড় অংশ ফিরে পান।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকের পর যারা প্রথমদিকে হাঁটতে পারতেন না, তাদের প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ ছয় মাসের মধ্যে আবার স্বাধীনভাবে হাঁটার সক্ষমতা অর্জন করেন। অবশ্য কারও ক্ষেত্রে উন্নতি দ্রুত হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে বেশি সময় লাগে। তাই শুরুতেই হতাশ না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এই উন্নতির পেছনে রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের একটি অসাধারণ ক্ষমতা, যার নাম নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity)। সহজ ভাষায়, মস্তিষ্কের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আশপাশের সুস্থ কোষগুলো নতুনভাবে নিজেদের সংগঠিত করে কিছু কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করার চেষ্টা করে। অনেকটা বিকল্প রাস্তা তৈরি হওয়ার মতো। ফলে ধীরে ধীরে হাত-পায়ের নড়াচড়া ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা ফিরে আসতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কেও সীমিত পরিসরে নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হতে পারে, যাকে নিউরোজেনেসিস (Neurogenesis) বলা হয়। যদিও স্ট্রোক থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার ভূমিকা এখনও গবেষণাধীন, তবুও এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য আশাব্যঞ্জক একটি ক্ষেত্র।

স্ট্রোকের প্রভাব শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক রোগীর মধ্যে মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়। বিশেষ করে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকে আক্রান্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগী কোনো না কোনো মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। তারা আগের মতো আনন্দ অনুভব করতে পারেন না, সবসময় মন খারাপ থাকে, এবং অনেক সময় সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আমরা দেখেছি, প্রথমবার ইস্কেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মানসিক রোগের হার উল্লেখযোগ্য। তাই স্ট্রোক রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, ওষুধ এবং মনোসামাজিক সহায়তার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। (Inam MS, Roy P, Rahaman M, Dey GS. Psychiatric morbidity among the patients of first ever ischaemic stroke. BJPsych Open. 2022;8(S1):S54-S55. doi:10.1192/bjo.2022.201; PMCID: PMC9378143)
স্ট্রোক মানেই জীবনের শেষ নয়, নয় হতাশা। অনেক রোগী ধীরে ধীরে আবার হাঁটেন, নিজের কাজ নিজে করেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। এজন্য প্রয়োজন সময়, ধৈর্য, নিয়মিত পুনর্বাসন, পরিবারের সহযোগিতা এবং নিজের প্রতি আস্থা। সঠিক চিকিৎসা ও অনুশীলনের মাধ্যমে স্ট্রোকের পরও নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব।
পরামর্শদাতা- ডা. সাঈদ এনাম; এমবিবিএস -ডিএমসি, এমফিল -সাইকিয়াট্রি; এসোসিয়েট প্রফেসর, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ
এনএম