images

লাইফস্টাইল

যৌথ গায়ে হলুদ: বদলে যাওয়া চালচিত্র 

লাইফস্টাইল ডেস্ক

১৮ মে ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম

একসময় বাঙালির বিয়ের গায়ে হলুদ মানেই ছিল বাড়ির উঠোনে বাঁশের প্যান্ডেল, উঠোনজুড়ে আলপনা, কলাপাতায় সাজানো মিষ্টি, কাঁচা হলুদের মিষ্টি ঘ্রাণ আর গাঁদা ফুলের ছড়াছড়ি। সঙ্গে ভেসে ওঠত নারীদের কণ্ঠে লোকগান। পাত্রপক্ষ আর পাত্রীপক্ষের আয়োজনও হতো আলাদা। দুই বাড়ির আবেগ, আচার আর আত্মীয়তার ভিন্ন ভিন্ন রঙ মিলেই যেন তৈরি হতো বিয়ের পূর্ণতা। 

‘হাজার বছর ধরে’ কিংবা ‘মনপুরা’ ছায়াছবির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। টুনিদের সহজ সরল জীবনের ছবিতে মিশে থাকত গ্রামীণ সুর, আত্মীয়স্বজনের সরল আনন্দ আর লোকজ ঐতিহ্যের নিবিড় উপস্থিতি। কিন্তু হাজার বছর ধরে চলা সেই ঐতিহ্যে এখন বেশ বদল এসেছে। শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর সময়ের অভাবে এখন আর বর কনের গায়ে হলুদ আলাদা উঠোনে নয়, শহরের অভিজাত কনভেনশন সেন্টারে একই মঞ্চে বসছেন পাত্র-কনে। আলো ঝলমলে সাজসজ্জা, ডিজে মিউজিক, ধোঁয়ার কৃত্রিম আবহ আর কোরিওগ্রাফি করা নাচে গায়ে হলুদ যেন অনেকাংশে পরিণত হয়েছে “প্রি-ওয়েডিং শো”-তে।

আগে গায়ে হলুদ হতো একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে। পাটায় কাঁচা হলুদ বাটার একটা রেওয়াজ ছিল, যেখানে বাড়ির মেয়েরা গল্প করতে করতে হলুদ বাটতো। এখন বাড়ির ছাদের বদলে জায়গা করে নিয়েছে বিশাল কনভেনশন হল বা ওপেন এয়ার রিসোর্ট। শুধু গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানোর দিন এখন আর নেই। সেখানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের “থিম ডেকোরেশন”-ই মুখ্য। বর কনের পোশাক থেকে শুরু করে অতিথিদের সাজপোশাক, সবই হয় সেই থিমের সাথে মিলিয়ে। হলুদ রঙের পাশাপাশি এখন মেজেন্টা, সবুজ বা নীল রঙের থিমও বেশ জনপ্রিয়। ফটোগ্রাফি এখন উৎসবের অনেক বড় একটি বিষয়। তাই ছবি সুন্দর আসার জন্য তৈরি করা হয় চোখ ধাঁধানো সব ব্যাকড্রপ, ওয়েলকাম বোর্ড এবং ফটো বুথ।

gaye_holud

জসীমউদ্দীনের কবিতায় কিংবা পুরনো সাহিত্যে বিয়ের যে গীতের কথা আমরা পড়ি, আজকাল তা আর খুব একটা শোনা যায় না। একসময় গায়ে হলুদ মানেই ছিল উঠোনে বসে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের কুলার বাড়ি আর বিয়ের গীত। সেই গানগুলোতে শুধু আনন্দই থাকত না, মিশে থাকত নতুন জীবনের শুরুতে মেয়েকে বিদায় দেওয়ার একটা চাপা কষ্ট ও আবেগ।

এখন সময়ের সাথে সেই গীতের জায়গা দখল করেছে বড় সাউন্ড সিস্টেম আর ঝলমলে লাইটিং। আসর বসিয়ে মুখে গান গাওয়ার চল এখন আর নেই বললেই চলে, বরং আধুনিক গানের তালে নাচতেই সবাই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বর ও কনের বন্ধু বা পরিবারের সদস্যরা এখন রীতিমতো পেশাদার কোরিওগ্রাফার রেখে আগে থেকেই নাচের মহড়া দেয়। আর যেহেতু এখন দুই পরিবারের যৌথ হলুদ হয়, তাই বর ও কনে পক্ষের এই নাচের লড়াইটাই হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পুরনো সেই সুর হয়তো হারিয়ে গেছে, ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজেদের শেকড়ের সুর থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু নাচে গানে ভরপুর এই নতুন উদযাপনের আনন্দও পুরো আয়োজনকে দারুণভাবে মাতিয়ে রাখে।

খাবারের আয়োজনেও পুরনো আর নতুনের পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। আগে গায়ে হলুদে নানা পদের মিষ্টি বা বাহারি নকশার পিঠার চল ছিল সবচেয়ে বেশি। অতিথিদের মিষ্টিমুখ করানোই ছিল প্রধান রীতি। এখন সেখানে মূল খাবারের পাশাপাশি থাকে ফুচকা, চটপটি, হাওয়াই মিঠাই বা কাবাবের লাইভ স্টেশন। পানীয় হিসেবে যুক্ত হয়েছে কোল্ড কফি এবং ফিউশন ডেজার্ট। বৈচিত্র্য অবশ্যই খারাপ নয়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বাঙালির উৎসবে বাঙালিয়ানা কোথায়? অতিথিরা কখনো কখনো বুঝতেই পারেন না, এটি বাঙালি বিয়ের অনুষ্ঠান নাকি কোনো করপোরেট পার্টি।

holud

এত চাকচিক্যের ভিড়ে কোথাও যেন আমাদের পুরনো বাঙালিয়ানা কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে। উপন্যাসের পাতায় পড়া সেই সহজ সরল পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা বড় ভেন্যুর ছকে বাঁধা আয়োজনে অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন সেই আবেগ অনেকটাই মুছে গিয়ে অনুষ্ঠান হয়ে উঠছে “ফটোজেনিক” মুহূর্ত তৈরির প্রতিযোগিতা। সবকিছুতেই একটা নিখুঁত হওয়ার চাপ থাকে।

ছবি সুন্দর হতে হবে, নাচ ভালো হতে হবে, সাজ নিখুঁত হতে হবে। এই প্রদর্শনের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক সময় উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দটাই ফিকে হয়ে যায়। এছাড়া সব কিছু একসাথে করতে গিয়ে অনেক সময় অতিরিক্ত খরচ আর লোক দেখানো প্রতিযোগিতাও চোখে পড়ে।

holud_1

আরেকটি চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হলো হলুদ মাখানোর রীতিতে। গায়ে হলুদের মূল উপাদান যে হলুদ, সেটিই এখন অনেকে মাখতে চান না। ভারী মেকআপ নষ্ট হওয়ার ভয়ে কিংবা দামি পোশাকে দাগ লাগার চিন্তায় কনে থেকে শুরু করে অতিথিরাও বেশ সতর্ক থাকেন। ক্যামেরার সামনে নিখুঁত ছবি তোলার জন্য গালে আলতো করে একটু হলুদ ছুঁইয়ে দেওয়ার মধ্যেই এখন এই রীতি সীমাবদ্ধ। আগে আপনজনদের সাথে হলুদ মাখামাখি নিয়ে যে একটা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল, সাজগোজ আর কৃত্রিমতার চাপে তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। 

সময়ের সাথে উৎসবের রূপ বদলাবে আর মানুষের রুচি পাল্টাবে, এটাই খুব স্বাভাবিক। পরিবর্তনের এই স্রোতকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নতুন যুগের এই আয়োজনে হয়তো অনেক নতুন আনন্দও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে আমরা যদি নিজেদের সংস্কৃতির শেকড়টাই ভুলে যাই, তাহলে উৎসবের আসল প্রাণ বলে কিছু থাকবে না।

গায়ে হলুদ তো কেবল নিয়ম রক্ষার কোনো অনুষ্ঠান নয়। এটি আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য, আবেগ আর লোকজ সংস্কৃতির খুব কাছের একটি অধ্যায়। আয়োজনে নতুনত্ব আসুক, আধুনিকতার ছোঁয়াও থাকুক। তবে এই সবকিছুর ভিড়েও যদি আমাদের বাংলার মাটির গন্ধটুকু সযত্নে ধরে রাখা যায়, তবেই বাঙালির গায়ে হলুদ সত্যিকার অর্থে বাঙালির থেকে যাবে।

এনএম