images

লাইফস্টাইল

ক্যানসারের ওষুধ শরীরে কাজ করছে কি না বুঝবেন কীভাবে?

নিশীতা মিতু

১৭ মে ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

ক্যানসার একটি প্রাণঘাতী মারাত্মক জটিল রোগ। সময়মতো নির্ণয় আর চিকিৎসা না করানো গেলে এই রোগে মৃত্যুবরণ করেন রোগী। তাই রোগটি নিয়ে মানুষের মনে আতঙ্কের শেষ নেই। একসময় ক্যানসার বলতেই মৃত্যু অবধারিত ধরা হতো। বর্তমানে এই ধারণা থেকে মানুষ বেরিয়ে এসেছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়ে। আর প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা হলে রোগী সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেন। 

ক্যানসার কী? 

বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায়, যখন শরীরের কোনো স্থানে অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে কোষ বৃদ্ধি হয়ে চাকা বা পিণ্ডের সৃষ্টি হয়, তখন ক্যানসার রূপ ধারণ করে। এটি রক্তনালী ও লসিকানালীর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে মানুষকে অকাল মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।

cancer_1

ক্যানসারের চিকিৎসা 

ক্যানসার আধুনিক চিকিৎসায় একটি বহুল ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি হলো কেমোথেরাপি। এটি এমন এক ধরনের চিকিৎসা যার মাধ্যমে ক্যানসারের সেলগুলোকে ধ্বংস করা হয় এবং সেগুলোর বিস্তার থামানো হয়। তবে সব ধরনের ক্যানসারের জন্য এক ধরনের চিকিৎসা প্রযোজ্য নয়। বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার সেল বিভিন্ন ধরনের ওষুধে সাড়া দেয়। কেমোথেরাপির সর্বোচ্চ ফল পেতে আট ধরনের ওষুধের সমন্বয় করা হয়। 

ক্যানসারের চিকিৎসায় ওষুধের ব্যবহার

ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোকে কাজের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। চিকিৎসকরা রোগীর ক্যানসারের ধরন এবং পর্যায় অনুযায়ী নির্দিষ্ট ওষুধ বা একাধিক পদ্ধতির সংমিশ্রণ নির্বাচন করেন। 

cancer_2

কেমোথেরাপি: এটি ক্যানসার চিকিৎসায় সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি যেখানে শক্তিশালী রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করে দ্রুত বিভাজনশীল ক্যানসার কোষগুলোকে ধ্বংস করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ডক্সোরুবিসিন (Doxorubicin) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ওষুধ যা স্তন ক্যানসার ও লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত।

টার্গেটেড থেরাপি: সরাসরি ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে এই ওষুধগুলো। ফলে সুস্থ কোষের ক্ষতি কম হয়। উদাহরণ: ট্রাস্টুজুম্যাব (Trastuzumab), বেভাসিজুম্যাব (Bevacizumab) ।

cancer_4

ইমিউনোথেরাপি: এটি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (Immune system) শক্তিশালী করে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। আধুনিক ইমিউনোথেরাপি ওষুধ হিসেবে বর্তমানে বেশ কার্যকর ওষুধ হলো- নিভোলুম্যাব (Nivolumab) এবং পেমব্রোলিজুম্যাব (Pembrolizumab)। 

হরমোন থেরাপি: কিছু ক্যানসার (যেমন স্তন বা প্রোস্টেট ক্যানসার) বাড়ার জন্য শরীরের হরমোন দায়ী থাকে। এই থেরাপির ওষুধগুলো হরমোনের উৎপাদন বন্ধ করে বা এদের কাজে বাধা দিয়ে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি থামায়। 

cancer_5

বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত কিছু ক্যানসার নিরোধক ওষুধ 

১. পেমব্রোলিজুম্যাব (Pembrolizumab) – ইমিউনোথেরাপিতে ব্যবহৃত।
২. নিভোলুম্যাব (Nivolumab) – আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত অন্যতম ইনজেকশন। 
৩. ট্রাস্টুজুম্যাব (Trastuzumab) – বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের জন্য।
৪. সুনিটিনিব (Sunitinib) – কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্যানসারের জন্য।
৫. ইব্রুটিনিব (Ibrutinib) – রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত। 

সতর্কবার্তা: 

ক্যানসারের যেকোনো ওষুধ বা চিকিৎসা অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (Oncologist) পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং কার্যকারিতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ বাটিত কোনো ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না। 

cancer_3

শরীরে ক্যানসারের ওষুধ কাজ করছে কি না বোঝার উপায় 

ক্যানসারের ওষুধ শরীরে ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত ফলো-আপ টেস্ট। শারীরিক উপসর্গ, ইমেজিং টেস্ট (যেমন- সিটি স্ক্যান বা এমআরআই) এবং রক্ত পরীক্ষার (যেমন- টিউমার মার্কার) মাধ্যমে চিকিৎসক নির্ধারণ করেন ক্যানসারের বৃদ্ধি হয়েছে না কি সংকোচন হয়েছে। 

১. মেডিকেল ইমেজিং ও পরীক্ষা (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়)

টিউমারের আকার: ইমেজিং টেস্ট (যেমন- সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পিইটি স্ক্যান) করে দেখা হয় মূল টিউমারটি আগের চেয়ে ছোট হয়েছে কি না বা নতুন কোনো জায়গায় ছড়িয়েছে কি না। ছোট হলে বুঝতে হবে ওষুধ কাজ করছে। আর নতুন জায়গায় ছড়ালে বুঝতে হবে ওষুধে কাজ হচ্ছে না। 

ক্যানসার মার্কার: এক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষা করে দেখা হয় ক্যানসার মার্কার (যেমন- CA 125, PSA, CEA) এর মাত্রা কমেছে কি না। এই মাত্রা কমা থেরাপি কাজ করার বড় প্রমাণ।

cancer_6

২. শারীরিক উপসর্গের উন্নতি

  • ক্যানসারের কারণে হওয়া ব্যথা, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
  • স্বাভাবিক ক্ষুধা ফিরে পাওয়া ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকা।
  • টিউমারের চাপ কমে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট অঙ্গের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাওয়া।

শরীরে এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে বোঝা যায় ওষুধ শরীরে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে বা কাজ করছে। 

৩. রক্তের রিপোর্ট স্বাভাবিক হওয়া

ক্যানসারের কারণে রক্তে হিমোগ্লোবিন, শ্বেতকণিকা বা অণুচক্রিকার মাত্রা কমে যেতে পারে। যদি থেরাপির পর তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে তাহলে বুঝতে হবে ওষুধ কাজ করছে। 

cancer_7

ফলাফলের ধাপসমূহ

সম্পূর্ণ রেসপন্স: টিউমার সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
আংশিক রেসপন্স: টিউমারের আকার আগের চেয়ে সংকুচিত হওয়া।
স্থিতিশীল অবস্থা: টিউমারটি বড়ও হচ্ছে না, আবার ছোটও হচ্ছে না।

থেরাপির ফলে সাময়িক কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন- ক্লান্তি, চুল পড়া বা বমি ভাব হতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকা মানেই যে থেরাপি কাজ করছে না এমন নয়। একইভাবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না হওয়া মানেই যে কাজ করছে— তা-ও নয়। সঠিক মূল্যায়নের জন্য অনকোলজিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

তথ্যসূত্র: ক্যানসার রিসার্চ ইউকে, হেলথলাইন, কেয়ার হসপিটাল ইত্যাদি 

এনএম