images

লাইফস্টাইল

রোদ-বৃষ্টি ছাপিয়ে ছাতার পথচলা

লাইফস্টাইল ডেস্ক

২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৬ এএম

বর্ষাকাল এলেই আমাদের সবচেয়ে চেনা সঙ্গীটি হয়ে ওঠে ছাতা। বাইরে মেঘ জমলেই হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাই তাকে। অবশ্য নাগরিক ব্যস্ততার কাটফাটা রোদেও ছাতা হয় সঙ্গী। অনেকের কাছে ছাতা কেবল রোদ-বৃষ্টি ঠেকানোর জন্য দরকারি এক জিনিস। কিন্তু এর বাইরেও আছে দীর্ঘ ইতিহাস, রয়েছে বৈচিত্র্য, আর আছে অজস্র মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প।

ছাতার জন্ম ঠিক কোথায় হয়েছে, সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও একমত হওয়া যায় এই জায়গাটাতে, প্রাচীন সভ্যতার মানুষ ছাতাকে প্রথম ব্যবহার করেছে রোদ থেকে বাঁচতে। মিসরের রাজপরিবার, চীনের অভিজাতরা বা ভারতের রাজারা ছাতা ব্যবহার করতেন মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। তখন সাধারণ মানুষের হাতে ছাতা ছিল না, কল্পনাতেও ছিল না।

চীনারা প্রথম ছাতাকে বৃষ্টির উপযোগী করে তোলে। বাঁশ, কাগজ, মোম আর বার্নিশ দিয়ে তৈরি সেই ছাতা ছিল একাধারে ব্যবহার্য এবং নান্দনিক। ভারতে মুঘল আমলে রাজাদের মাথার ওপর ছাতা ধরা হতো সম্মান জানানোর জন্য। এখনো অনেকে বিশেষ ব্যক্তির মাথার ওপর ছাতা ধরলে সেটা ‘সম্মান’ হিসেবেই ধরা হয়। চলচ্চিত্রের দৃশ্যেও দেখা যায় নায়ক কিংবা খলনায়কের অনুসারীরা তাদের মাথায় ছাতা ধরে রাখছে।

colorful-umbrellas-hanging-from-a-line_20250715_133240038

আজকে আমরা যে ছাতা ব্যবহার করি, তা অনেক রকমে বদলে গেছে। শহরের বাজারে রঙ-বেরঙের ভাঁজ করা ছাতা, ছোটদের কার্টুন ছাতা, আবার গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় মোটা কাপড় বা প্লাস্টিকে মোড়া খুঁটির মতো ছাতা। জাপানে এখনো হাতে তৈরি ‘ওয়াগাসা’ নামে ছাতা ব্যবহার হয়, যেগুলো সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। আধুনিক শহরে এমন ছাতাও আছে যেগুলোতে অতিবেগুনী রশ্মি ব্লকিং, অটো ওপেন-ক্লোজ ফিচার কিংবা এমনকি অ্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও!

ছাতা শুধু বৃষ্টি বা রোদ ঠেকানোর কাজেই আটকে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের অংশ, স্টাইল স্টেটমেন্ট, এমনকি প্রতিরোধের প্রতীক। ২০১৪ সালে হংকংয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচতে মাথার ওপর ছাতা ধরেছিল। সেই থেকেই আন্দোলনের নাম হয়ে যায় “আমব্রেলা মুভমেন্ট”। ছাতা হয়ে যায় প্রতিবাদের প্রতীক। তখন পৃথিবী দেখেছে, একটি সাধারণ জিনিস কিভাবে মানুষের অধিকার রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

খবর_বৃষ্টি_20250715_133312766

এরকমই বাংলাদেশেও অনেক সময় দেখা যায়, মিছিল-মিটিংয়ে ছাতা হাতে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে রোদ বা বৃষ্টি উপেক্ষা করে। কখনো কখনো ছাতার কাপড়েই লেখা থাকে প্রতিবাদের কথা।

ছাতাকে ঘিরে কত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, কত গল্প জমে আছে তা হয়তো হিসেব করাও যাবে না। কেউ প্রথম প্রেমে পড়েছে যখন কোনো এক বর্ষাদিনে এক ছাতার নিচে হেঁটেছিল কারো সঙ্গে। কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে স্কুল ফেরার সময় এক ছাতা ভাগ করে নিয়েছিল। পথের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিতে অচেনা কেউ এগিয়ে দেয় তার ছাতার অর্ধেকটা—সেই মুহূর্তে গড়ে ওঠে এক নীরব সম্পর্ক। এই ছাতার নিচে জন্ম নেয় হাজারো অনুচ্চারিত গল্প, চোখের ইশারায় বলা অনুভব, কিংবা চুপচাপ একসাথে হাঁটার অভ্যেস।

এমনও অনেক গল্প আছে যেখানে একটা ছাতা কাউকে মনে করিয়ে দেয় হারানো মানুষকে, পুরনো সময়কে। সেই ছাতাটা রেখে দেওয়া থাকে কোথাও—ভাঁজ করা, কিন্তু স্মৃতিতে জড়ানো।

chata_20250715_133343085

আজকের দিনে ছাতা আমাদের জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালে বের হওয়ার সময় ছাতা সঙ্গে আছে কিনা, সেটা দেখে নেওয়াই অভ্যাস। রাস্তায় বের হলেই নানা রকম ছাতার বাহার চোখে পড়ে; কেউ গম্ভীর কালো ছাতায়, কেউ আবার উজ্জ্বল লাল বা হলুদ রঙে, কেউ শিশুর হাতে স্পাইডারম্যান ছাতা, কেউ বৃদ্ধের হাতে বাঁশের লাঠির পুরনো ছাতা।

ছাতা যতটা সরল দেখতে, তার ব্যবহার ততটাই বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ছাতার এই ব্যতিক্রমী ব্যবহারগুলোই তার জয়যাত্রাকে করে তুলেছে চিরন্তন। নাচ, মঞ্চনাটক, মিউজিক ভিডিও কিংবা সিনেমার দৃশ্যে আলাদা আবহ তৈরি করে। বিশেষ করে বর্ষার গানগুলোতে ছাতার নান্দনিক উপস্থিতি দর্শককে আবেগে ভাসায়।

রঙিন ছাতা আজকাল অনেকেই ঘরের ইন্টেরিয়রে ঝুলিয়ে রাখেন আলোকসজ্জা, সাজের অংশ হিসেবে। বিয়ের অনুষ্ঠানে, বইমেলায় কিংবা ক্যাফে ডেকোরেশনে ছাতা দিয়ে তৈরি হয় ভিন্ন আবহ। এই জিনিসটিই কখনো আশ্রয়, কখনো রক্ষা, কখনো সম্পর্কের সূচনা, আবার কখনো একটি প্রতিবাদের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাতার কাজ বদলেছে, ব্যবহার বদলেছে, কিন্তু মানুষের জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা কমেনি।

ছাতার ইতিহাস দীর্ঘ, পথচলা বৈচিত্র্যময়, আর মানুষের জীবনে তার ভূমিকা খুবই ব্যক্তিগত। হয়তো সে রোদ বা  বৃষ্টির ছায়া দেয়, কিন্তু কখনো কখনো সে একটা মনের জায়গাও তৈরি করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ছাতা হয়ে থাকে নীরব, কিন্তু দৃশ্যমান একটি সাধারণ জিনিস, যার ছায়ায় আশ্রয় পায় সভ্যতা, সময় আর স্মৃতি। একটি ছাতার নিচে অনেক সময় গড়ায়, অনেক গল্প জমে থাকে। রোদ কেটে যায়, বৃষ্টি থেমে যায় কিন্তু ছাতার নিচের অনুভূতি রয়ে যায় বহুদিন।