images

লাইফস্টাইল

কিছু মানুষ কেন অন্যের সুখে খুশি হতে পারেন না?

নিশীতা মিতু

১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

কর্মব্যস্ততা যখন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তখন একটু স্বস্তি পেতে এয়ারবাড কানে গুঁজে নিই। মনকে শান্ত রাখার টোটকা হিসেবে এটি ভালোই কাজে দেয়। গানের ক্ষেত্রে অবশ্য আমি বেশ পিছিয়ে। পুরনো দিনের গানগুলোই হৃদয়ে পৌঁছে যায় দ্রুত। কানে বাজছে মান্না দে’র গাওয়া- ‘সবাই তো সুখী হতে চায়/ তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয়না’। 

আহা! কী গানের কথা! সত্যিই তো তাই। জীবনে আমরা সবাই সুখী হতে চাই। কিন্তু সুখ সবার ভাগ্যে জোটে না। আবার অনেকসময় অন্যের সুখ আমাদের সহ্য হয় না। মনে হয়, ওর সঙ্গে এত ভালো কিছু হলো কিন্তু আমার সঙ্গে কেন হলো না। ওর এত টাকা আছে, আমার নেই কেন? অমুক এত সুবিধা পাচ্ছে, আমি কেন পাচ্ছি না? ভাবতে ভাবতে অভিমানগুলো কখন যে ঈর্ষা, হিংসা বা ক্রোধে পরিণত হয় বুঝতেই পারি না। 

envy_1

ঈর্ষা মানুষের খুবই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে তা যদি সবক্ষেত্রে হয় তবে মুশকিল বটে। সমাজে কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা কিছুতেই অন্যের সুখ সহ্য করতে পারেন না। কারো কোনো ভালো সংবাদ পেলে তাদের মনে কেমন যেন অস্বস্তি হয়। ভালো সংবাদটির কোনো না কোনো খারাপ দিক বের করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। এটি কিন্তু মোটেও স্বাভাবিক নয়। 

কেন এমন হয়? হয়তো তারা নিজেকে অযোগ্য মনে করেন। কিংবা অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে শুরু করেন। যার কারণে অন্যদের সুখে কখনো মন থেকে খুশি হতে পারেন না। চলুন আরেকটু বিশদভাবে কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক- 

never-happy-for-others

১. আত্মমর্যাদার অভাব

কিছু মানুষ অন্যের আনন্দে খুশি হতে পারেন না, কারণ তারা নিজেদের জীবন নিয়ে সুখী নন। আত্মমর্যাদা বা আত্মমূল্যবোধের অভাবের কারণে তারা নিজেদেরকে সবার সাথে তুলনা করতে শুরু করেন। এমনকি নিজের খারাপ দিনগুলোকেও অন্যের ভালো দিনের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেন।

এই বিশেষ কাজটির কারণে মনে তীব্র অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। আত্মমর্যাদার অভাবের কারণে প্রায়ই এসব ব্যক্তিরা বিষণ্ণতায় ভোগেন, তাই অন্যের সুখে খুশী হতে পারেন না। 

envy

২. তীব্র ঈর্ষা

যদিও ঈর্ষাকে অপরিহার্যভাবে কোনো মানসিক রোগ বলা যায় না, কিন্তু এটি ব্যক্তিত্বের ব্যাধির একটি লক্ষণ হতে পারে। কখনও কখনও, অন্যের ভালো থাকা, সুখ, খুশি মনের মধ্যে তীব্র ঈর্ষার জন্ম দেয়। 

এমন পরিস্থিতিতে কোনো বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের কোনো সুসংবাদ শুনলে ঈর্ষা বিদ্বেষপূর্ণ রূপে প্রকাশ পেতে পারে। যদিও অল্প পরিমাণ ঈর্ষা টিকে থাকার সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে জীবনে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু অতিরিক্ত ঈর্ষা এর বিপরীত ফল দিতে পারে। 

envy_2

৩. নেতিবাচক চক্রে আটকে থাকা

আত্মসম্মান আর ঈর্ষার চেয়ে এই বিষয়টি ভিন্ন। নেতিবাচক চক্র বলতে বোঝানো হচ্ছে এসব মানুষ জীবনের বেশিরভাগ জিনিসের ইতিবাচক দিকটি দেখতে পান না। নেতিবাচক চিন্তাভাবনাই তাদের স্বাভাবিক মানসিকতায় পরিণত হয়।

এমন ব্যক্তিরা না নিজের কোনো কাজে সন্তুষ্ট হতে পারে, না অন্যের। বাইরে থেকে কোনো ইতিবাচক উৎসাহই এই নেতিবাচক মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে পারবে না। একমাত্র ব্যক্তি নিজেই এই চিন্তাধারাকে পাল্টে দিতে পারেন।

Why-cant-it-be-me-900-×-900px-1-768x768

৪. ভয় পাওয়া 

মাঝে মধ্যে অন্য কারোর সাফল্য কিছু ব্যক্তির জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিজের অবস্থান হারিয়ে ফেলা, গুরুত্ব কমে যাওয়া, অন্যের অবস্থানে পৌঁছাতে না পারার মতো ভাবনাগুলো তার মনে ভীতির কারণ হয়। ফলে সে অন্যের সুখ বা অর্জনে খুশি হতে পারেন না। 

৫. ক্ষোভ

কেউ কারো প্রতি ক্ষুব্ধ থাকলে তার সুখে কখনো খুশি হতে পারেন না। হয়তো একটি কাজ তিনি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। জীবনের অনেকটা সময় নষ্ট করেছেন। অন্য কেউ যখন সেই কাজটিই অনায়াসে করে ফেলেন তখন মনে তার প্রতি ক্ষোভের জন্ম নেয়। আর এই ক্ষোভের কারণেই কিছু মানুষ অন্যের সুখে আনন্দ পান না।  

selfish

৬. স্বার্থপরতা

একজন স্বার্থপর ব্যক্তি কখনোই অন্যের সুখ সহ্য করতে পারেন না। এমন ব্যক্তিরা জীবনে পরিপূর্ণতা খুঁজে পেতে অনেক কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেন ঠিকই, অথচ সত্য হলো তারা প্রিয়জনদের সাথে ভাগ করা আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন। 

৭. নার্সিসিস্টিক ডিসঅর্ডার

স্বার্থপর হওয়ার মতোই, নার্সিসিস্টিক ডিসঅর্ডারে ভোগা ব্যক্তিরা কখনোই অন্যের জন্য খুশি হতে পারেন না। নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে এমন অনেক বৈশিষ্ট্য থাকে যা অন্যের সুখে খুশি হতে বাধা দেয়। ব্যাপারটাকে বাংলায় আত্মমগ্নতা বলা যেতে পারে। 

0-selfish-dont-realize

এই ধরনের মানুষ প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকেন। কেবল নিজের সুখ, যোগ্যতা, অর্জনই তাদের চোখে পড়ে। অন্যের ভালো তারা কিছুতেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। 

আপনিও কি তাদের একজন যারা অন্যের সুখে খুশি হতে পারেন না? 

চলুন, আমরা নিজের সঙ্গে সৎ হই। আশেপাশের কেউ সফল হলে আমরা কি সত্যিই তাদের জন্য খুশি হই? উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তবে তা চমৎকার। আমাদের খুশিই হওয়া উচিত। একবার ভাবুন, আপনি কি চাইবেন না যে অন্যরা আপনার সাফল্য উদযাপন করুক? আর ঠিক এই কারণেই, আমাদেরও উচিত অন্যের আনন্দ বা অর্জন উদযাপন করা।

বিষয়টা খুবই সহজ। ভালো মানুষ হতে হলে আমাদের দয়ালু ও উদার হতে হবে। মনে রাখবেন, অন্যের সুখেই আমাদের প্রকৃত সুখ নিহিত। আসুন, আমরা অন্যের সুখে খুশি হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলি। তাহলেই জীবনে সত্যিকারের পরিপূর্ণতা লাভ করব।

তথ্যসূত্র: লার্নিং মাইন্ড 

এনএম