images

লাইফস্টাইল

কে তুমি ‘নন্দিনী’, ফুলের জগতে নতুন রাণী

নিশীতা মিতু

১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

‘কে তুমি নন্দিনী? আগে তো দেখিনি/ চলেছ এই পথে, রূপে যে রঙ্গিনী’—চলতি পথে কোনো অচেনা সুন্দরীকে দেখে আনমনে এই গান বেজে উঠতে পারে আপনার মনে। ফুলের জগতে নন্দিনীও ঠিক তেমন। চেনা কিন্তু অচেনা, রূপে মুগ্ধ হওয়ার মতো। 

বাংলাদেশে নন্দিনী ফুল ইউস্টোমা নামেই বেশি পরিচিত। কেউ কেউ আবার তাকে চেনেন লিসিয়েন্থাস নামে। তবে এসব কঠিন নামের তুলনায় নন্দিনী নামটিই এই ফুলের রূপের ব্যাখ্যা করতে পারদর্শী বেশি। 

nondini

নন্দিনী দেখতে অনেকটা গোলাপের মতো। তবে ফুলের রাণীর মতো অত কাঁটার আঘাত দেবে না আপনাকে। কাটাবিহীন এই ফুলের আদি নিবাস যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপান। গোলাপ শীতকালে বেশি ফুটলেও নন্দিনী ধরা দেবে শীত-বর্ষা-গ্রীষ্ম সব ঋতুতেই। খরা ও বর্ষাসহিষ্ণু এই ফুলের সংরক্ষণকালও গোলাপের চেয়ে বেশি। গোলাপের মতো তারও রয়েছে রঙের বাহার। অন্তত আট রঙে ফোটে ফুলটি। বাংলাদেশে অবশ্য সাদা, বেগুনি, সাদা-বেগুনির মিশেল— এই তিন রঙের নন্দিনী বেশি পাওয়া যায়। গোলাপি ও হলুদ নন্দিনীও মেলে অল্পস্বল্প। 

নন্দিনীর ইংরেজি নাম লিসিয়েন্থাস। এই নাম এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ ‘lissos’ ও ‘anthos’ থেকে। লিসোস অর্থ মসৃণ, অ্যান্থোস অর্থ ফুল। নন্দিনী ফুলের পাপড়ি মসৃণ। বাংলাদেশে ২০০৯ সাল থেকে এই ফুল নিয়ে গবেষণা করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম জামাল উদ্দিন। বাংলায় নন্দিনী নামটি তারই দেওয়া। 

nondini_1

এর বৈজ্ঞানিক নাম এস্টোমা গ্রান্ডিফ্লোরাম। Gentianaceae পরিবারভুক্ত জেনেটিনসিয়া পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের রকি পর্বত এলাকায় এর উৎপত্তি। মেক্সিকো, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর অংশের উষ্ণ অঞ্চলেও এই ফুল ফোটে। 

নন্দিনীর পাঁপড়িগুলো গোলাপের মতো হলেও এর খাড়া পাতা সমেত ডগা অনেকটা টিউলিপের মতো। ফুলের পাঁপড়িতে ছোপ ছোপ করে থাকা বিভিন্ন রংয়ের ছোঁয়া সৌন্দর্য্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। কাট-ফ্লাওয়ার হিসেবে এর জুড়ি নেই। 

nondini_2

এই ফুলের সৌন্দর্য দেখে অনেকে একে কৃত্রিম ফুল বলে ভুল করে। রঙের বৈচিত্র্যের কারণে নন্দিনী অতি অল্প সময়েই জাপান ও চীনের ফুলের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। জাপানের বাজারে প্রায় ৪৫ জাতের নন্দিনী পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বর্তমানে এই ফুল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেকে তাই নন্দিনীকে ফুলের ‘নতুন রাণী’ নামেই আখ্যায়িত করছেন। 

রঙরূপের এত বৈচিত্র্য সাধারণত অন্য ফুলে দেখা যায় না। এর ছয়টি পাঁপড়ি ঘিরে রেখেছে একটি স্ত্রী কেশর এবং পাঁচটি পুংকেশরকে। সরলপত্র বিন্যাসের এ ফুলের পাতাগুলোর সম্মুখ প্রান্ত কিছুটা তীক্ষ্ণ।

nondini_3

আমেরিকায় নন্দিনী ফুল পরিচিত ‘আমেরিকান গোলাপ’ নামে। এর গাছ মূল কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত। পাতার রং নীলাভ সবুজ। প্রতিটি গাছে একক ও দ্বৈত রঙে ৮০টির অধিক ফুল দেখা যায়। ফুল তোলার পর প্রায় ২০ দিন এবং গাছে ফোটা অবস্থায় ৩৫ থেকে ৪০ দিন সতেজ থাকে। চারা লাগানোর ৯০ দিনের মধ্যেই গাছ থেকে ফুল তোলা যায়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী নন্দিনী ৬.০-৬.৭ পিএইচ, দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মে। এর বীজের আকার খুবই ছোট। এই ফুল চাষ করা খুব একটা সহজ নয়। বিশেষ করে চারা তৈরি ও পরিচর্যার ব্যাপারে কিছু বিশেষ কৌশল নিতে হয়। মাটিতে বীজ পুঁতলে নন্দিনীর চারা গজায় না। বীজ ফেলতে হয় মাটির ওপরে। আবার মাটিতে বীজ গজিয়ে ওঠার মতো রস থাকতে হয়। মাটি বেশি ভেজা থাকলে গাছ পচে যাবে। মাটিতে রস কম থাকলে চারা গজাবে না ও গাছও বাড়বে না।

nondini_4

গ্রীন হাউসে এর চারা উৎপাদন করা যায়। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ উন্নত মানের মিহি মাটি বীজ অঙ্কুরোদগমের জন্য প্রয়োজন। অঙ্কুরোদগমের জন্য সাধারণত ১০-১২ দিন লাগে। চারায় চার জোড়া পাতা হলে চারা মাঠে রোপণ করা যায়। জমি ভালভাবে আড়াআড়ি চাষ দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে জৈবিক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে জমি তৈরি করে নিতে হয়। 

চাষের সময় চুন পাউডার জমিতে ছিটিয়ে দিলে ভালো ফল মেলে। প্রতি বর্গমিটারে ৪-৫ কেজি পচা গোবর, ১৫০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করে ভালোভাবে জমিতে মেশাতে হবে। বেডের প্রস্থ ১ মিটারে সীমাবদ্ধ রাখলে আন্তঃপরিচর্যা নিতে সুবিধা হয়। মাটিতে চারা থেকে চারা এবং সারি থেকে সারি ১৫ সেন্টিমিটার দূরত্ব রাখতে হবে। প্রতিদিন চারা হাল্কা সেচের প্রয়োজন। চারা একটু বড় হলে গোড়ায় মাটি তুলে দিলে ফুলের আকার বড় হয়। চারা লাগানোর ২ মাস থেকেই ফুল আসতে শুরু হয়।

nondini_5

নন্দিনীর প্রতি ডালে গড়ে ২০-২৫টি ফুল ফোটে বিধায় একেকটি গাছ থেকে কমপক্ষে ৮০-৯০টি ফুল পাওয়া যায়। সাধারণত জুন-জুলাই মাসে ফুল ফুটলেও সারা বছর ফুল উৎপাদন সম্ভব। জুন-জুলাই মাসে ফুলের বীজ বপন করতে হয়। রোগ ও পোকামাকড়ের সমস্যা নেই বললেই চলে। 

ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে নন্দিনীর বিকল্প কমই আছে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই ফুল ফুলদানিতে ১০-১৫ দিন ভালো থাকে। পানিতে সামান্য সুক্রোজ মিশিয়ে দিলে এটি ২০-২৫ দিন রাখা যায়। নন্দিনী বীজ উৎপাদন খুবই সহজ, প্রচলিত পদ্ধতিতে মাঠে বীজ উৎপাদন সম্ভব। নন্দিনী ফুলের লম্বা বোঁটা ও বর্ণ বৈচিত্রতার কারণে এর চাহিদা পৃথিবীজুড়ে। 

এনএম