লাইফস্টাইল ডেস্ক
১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
আমরা দাম দিই— কিন্তু সব কিছুর না। আমরা মূল্য বুঝি— কিন্তু সব শ্রমের না।
একজন কারিগর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সুতো আর সূচের ফোঁড়ে ফোঁড়ে একটা নকশা গড়ে তোলেন। তার আঙুলের ছোঁয়ায় কাপড় শুধু কাপড় থাকে না। তা হয়ে ওঠে গল্প, ঐতিহ্য, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। অথচ সেই শিল্প, যা তৈরি হতে কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ লাগে, বাজারে দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ টাকার দামে।
প্রশ্নটা সেখানেই— কেন সেই ৫০০ টাকার হস্তশিল্প ৫০০০ টাকার সম্মান পায় না? সমস্যাটা কি পণ্যে? না, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমরা ব্র্যান্ডের পেছনে ছুটি। একটা বিদেশি নাম, চকচকে ট্যাগ, শোরুম— এসবের জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করি। কিন্তু গ্রামীণ নারীর হাতে বানানো নকশি কাঁথা দেখলে প্রথম প্রশ্ন—“এত দাম কেন?”

এখানেই চিন্তার সংকট। আমরা লেবেল দেখি, ভেতরের গল্প দেখি না। একটা হস্তশিল্প শুধু জিনিস নয়। এর ভেতরে এক মায়ের সংসার চালানোর চেষ্টা, এক মেয়ের স্বপ্ন, এক পরিবারের টিকে থাকার লড়াই এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতির টুকরো। কিন্তু আমরা সেই গল্পের দাম দিই না। শুধু হিসাব করি—“কত সস্তায় পাওয়া যায়?”
বাজার ব্যবস্থাও দায়ী। কারিগর প্রাপ্য মূল্য পান না। মাঝখানে একাধিক হাত—শহরে এনে ৫০০ টাকার জিনিস ১৫০০-এ বিক্রি হয়, কিন্তু টাকা যায় না কারিগরের কাছে। আর কারিগর নিজে বিক্রি করলে আমরা বলি—“এত দাম কেন?” এই দ্বিমুখীতাই শিল্প পিছিয়ে পড়ছে।

আরও বড় কারণ—নিজের জিনিসকে ছোট করে দেখা। বিদেশি হলে “কোয়ালিটি, দেশী হলে “চলেই যায়”। এই মানসিকতা না বদলালে ৫০০ টাকার হস্তশিল্প কখনো ৫০০০ টাকার সম্মান পাবে না।
সম্মান টাকার অঙ্কে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। যেদিন বুঝব হাতে বানানো জিনিস মেশিনের সাথে তুলনীয় নয়, যেদিন গর্ব করে বলব—“এটা আমাদের কারিগরের কাজ, সেদিন শিল্প তার মর্যাদা পাবে।
দরকার ছোট পরিবর্তন— ক্রেতা হিসেবে সচেতন হওয়া, কারিগরের গল্প জানা, নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান করা। একটা জাতির পরিচয় বিল্ডিংয়ে নয়, মাটির গন্ধে, মানুষের হাতের শিল্পে। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আয়নায় তাকান। সমস্যা বাজারে নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
লেখক: হস্তশিল্প উদ্যোক্তা, শিল্পপুরাণ
এনএম