লাইফস্টাইল ডেস্ক
০২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
মধ্য এশিয়ার উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজমান। ইরানের সঙ্গে চলছে আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ। আর এই সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি শিরোনামে এসেছে হরমুজ প্রণালীর নাম। তার কারণও আছে বটে। বিশ্বজুড়ে রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি সঙ্কটের নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করছে এই সঙ্কীর্ণ বাণিজ্য জলপথ।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এই প্রণালীর নাম হরমুজ কেন? এই শব্দের অর্থ কী? কীভাবে হলো নামকরণ? চলুন আজ এসম্পর্কেই জেনে নেওয়া যাক-

হমমুজ নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন পারস্যের অনুষঙ্গ। অগ্নির উপাসক জরথ্রুস্ট-বাদের প্রভাব রয়েছে এই নামে। জরথ্রুস্ট প্রচারিত ধর্মের জরথ্রুস্টিয়ান দেবতা হলেন আহুরা মাজডা বা হোরোমাজেস।
পরবর্তীতে এই আহুরা শব্দই পরিবর্তিত হয় ‘ওহরমাজদ’ বা ‘হরমোজ’ নামক শব্দে। সেই শব্দই কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়ে নাম হয় ‘হরমুজ’। আরও এক মত অনুযায়ী, হরমুজের অর্থ ‘খেজুরের সাম্রাজ্য’।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, জোরোস্ট্রীয় ধর্মাবলম্বী সাসানিয়া সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী শাসক দ্বিতীয় হরমিজের স্ত্রী ইফরা হার্মিদের নাম থেকে হরমুজ শব্দের জন্ম।
১৬৭ কিলোমিটার লম্বা হরমুজ প্রণালী পারস্য মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে ভারত মহাসাগরকে। এই প্রণালীর উত্তরে অবস্থান করছে ইরান এবং দক্ষিণে সংযুক্ত আছে আরবআমিরশাহী ও ওমান। হরমুজের গড় প্রস্থ ২১ কিমি। তবে সব জায়গায় এই প্রস্থ সমান নয়।

দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই পারস্য সাগর অঞ্চলে বাণিজ্যের দৌলতে হরমুজ নামটা কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। দ্বাদশ শতকে ওমান থেকে ইরানে পালিয়ে আসেন মহম্মদ দিরামকু। বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে তিনি ‘মুলক-ই-হরমুজ’ বা হরমুজ রাজ্য স্থাপন করেন। ১৬২২ সাল পর্যন্ত এর অস্তিত্ব ছিল। এই মুলক-ই-হরমুজ থেকেই হরমুজ উপসাগরের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়।
বিশ্বের দৈনিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে, যা দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সমান। পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ততম সামুদ্রিক তেলপথটি এশিয়া, ইউরোপ ও তার বাইরের দেশগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি জলসড়ক হিসেবে ব্যবহার করে।

তেল ছাড়াও, এটি বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চালানের একটি বড় অংশ পরিচালনা করে। প্রকৃতপক্ষে, এই প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত এলএনজি-র প্রায় ৮৩ শতাংশ যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চিনের মতো এশীয় দেশগুলোতে। এটি পূর্ব দিকে জ্বালানি রফতানির জন্য একটি দ্বৈত-ভূমিকার করিডোর হিসেবে কাজ করে।
হরমুজ প্রণালী সংকীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও যথেষ্ট গভীর। এর বেশিরভাগ অংশের গভীরতা ২০০ থেকে ৩০০ ফুটের মধ্যে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জাহাজ ভিএলসিসি (ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার)-এর জন্য এই গভীরতা যথেষ্টের চেয়েও বেশি। এই ভাসমান দৈত্যগুলো সমুদ্রতল স্পর্শ না করেই একবারে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল পরিবহণ করে।

ঐতিহাসিকভাবে, এই অঞ্চলটি ছিল বিভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থল। শত শত বছর ধরে, বণিকরা পূর্ব ও পশ্চিমকে সংযোগকারী এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করত। তেলের পাশাপাশি চলত মশলা, রেশম এবং চিন্তাধারারও প্রবাহ।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজগুলো চলাচল মসৃণ রাখতে ‘ট্র্যাফিক সেপারেশন স্কিম’ ব্যবহার করে, যা মহাসড়কের লেনের একটি সামুদ্রিক সংস্করণ। ট্যাঙ্কারগুলো একটি বাফার জোন দ্বারা বিভক্ত নির্দিষ্ট লেনে চলাচল করে, যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম এই জলপথে সংঘর্ষ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
তথ্যসূত্র: লরেন্স জি পটার সম্পাদিত ‘দ্য পার্সিয়ান গালফ ইন হিস্ট্রি’
এনএম