লাইফস্টাইল ডেস্ক
০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
ইটের জঙ্গলে ঘেরা রাজধানী ঢাকায় এক টুকরো সবুজ এখন হয়ে উঠছে আধুনিক জীবনশৈলীর অংশ। বারান্দা বা ছাদে বাগান করতে গিয়ে মাটি সংগ্রহ, ভারী টব বহন কিংবা পোকামাকড়ের উপদ্রবে যারা বিরক্ত, তাদের জন্য ‘হাইড্রোপনিক্স’ (Hydroponics) মাটিহীন চাষাবাদ একটি কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান। উন্নত বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত এই প্রযুক্তি এখন বাংলাদেশের শহুরে জীবনেও নতুন মাত্রা যোগ করছে।
সহজভাবে বলতে গেলে, মাটির পরিবর্তে পানি বা মাটিবিহীন ‘সাবস্ট্রেট’ (যেমন কোকো-ডাস্ট, পারলাইট বা নারিকেলের ছোবড়া) ব্যবহার করে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের পদ্ধতিই হাইড্রোপনিক্স। এতে গাছ সরাসরি পুষ্টিসমৃদ্ধ দ্রবণ থেকে খনিজ গ্রহণ করে। ফলে স্থান ও পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং এটি বিশ্বের অন্যতম নিবিড় চাষপদ্ধতি হিসেবে পরিচিত।

ওজন ও জায়গা সাশ্রয়: মাটির ভারী টবের বদলে হালকা পাত্র ব্যবহৃত হয়, ফলে ভবনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। ভার্টিক্যাল পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় বেশি গাছ লাগানো যায়।
পরিচ্ছন্নতা: মাটি বা কাদার ঝামেলা নেই। মাটিবাহিত রোগ ও আগাছার উপদ্রবও অনেক কম।
দ্রুত বৃদ্ধি: সরাসরি পুষ্টি পাওয়ায় গাছ সাধারণ চাষের তুলনায় ২০–৩০ শতাংশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন: শীতের আগাম সবজি চাষে সফলতার উপায়
সবচেয়ে সহজ ও বিদ্যুৎবিহীন পদ্ধতি। একটি ঢাকনাযুক্ত পাত্রে পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি ভরে তার ওপর নেট পটে গাছ বসানো হয়।
প্লাস্টিকের পাইপের ভেতর দিয়ে পাম্পের সাহায্যে পুষ্টি দ্রবণ প্রবাহিত করা হয়। এটি দেখতে আধুনিক এবং তুলনামূলকভাবে বেশি উৎপাদনক্ষম।
এই পদ্ধতিতে লেটুস, পুদিনা, ধনেপাতা, পালং শাক, টমেটো, শসা ও ক্যাপসিকাম সহজেই চাষ করা যায়।
বর্তমানে উচ্চমূল্যের ফল ‘নেটেড মেলন’ চাষেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) এ বিষয়ে সফল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। জাপানি জাতের ‘পান্না’ বা ‘মিয়াবি’ মেলন এখন সীমিত পরিসরেও উৎপাদন সম্ভব।

আরও পড়ুন: বর্ষাকালে শাক খেতে মানা করা হয় কেন?
চারা তৈরি: কোকো-ডাস্টে ‘সেল ট্রে’-তে বীজ বপন করে ১০–১৪ দিনের মধ্যে চারা তৈরি করা যায়।
পুষ্টি ও pH নিয়ন্ত্রণ: পানির pH ৫.৫–৬.৫ রাখা আদর্শ। ‘ইসি মিটার’ দিয়ে পুষ্টির মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত এবং নির্দিষ্ট সময় পর দ্রবণ পরিবর্তন করতে হয়।
পরাগায়ন: টমেটো বা মেলনের মতো গাছে প্রয়োজন অনুযায়ী হাতে পরাগায়ন করতে হয়।
ছাঁটাই: নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে গাছের আগা ছাঁটাই করলে ফলন ভালো হয়।
শুরুর সেটআপ ও মানসম্মত পুষ্টি সংগ্রহ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি লাভজনক। বর্তমানে তরুণরা আইসিটি (ICT) ও আইওটি (IoT) ব্যবহার করে এই খাতে আগ্রহী হচ্ছেন, যা নগর কৃষিকে আরও স্মার্ট করে তুলছে।
নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইড্রোপনিক্স শখের গণ্ডি পেরিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানে পরিণত হচ্ছে। আপনার বারান্দার ছোট্ট কোণটিও হতে পারে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও উৎপাদনশীল সবুজ খামার।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, আধুনিক কৃষি গবেষণা তথ্যভাণ্ডার