images

লাইফস্টাইল

নারীর নিজের জন্য সময়: বাস্তবতা না কি বিলাসিতা?

লাইফস্টাইল ডেস্ক

০৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের যেন কোনো শেষ নেই। কেউ ছুটছেন অফিসে, কেউ সামলাচ্ছেন নিজের ব্যবসা, আবার কেউবা পরম যত্নে আগলে রাখছেন পুরো সংসার। সবার সব প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে একজন নারী নিজের জন্য ঠিক কতটা সময় পান? দিনশেষে নিজের পছন্দমতো একটু সময় কাটানো কি এখনকার দিনে খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়, নাকি শুধুই বিলাসিতা?

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ঢাকা মেইল-এর পক্ষ থেকে তানজিদ শুভ্র কথা বলেছিলেন নানা পেশার কয়েকজন নারীর সাথে। সংসারের রোজনামচা আর পেশাগত দায়িত্বের ভিড়ে তাদের ‘নিজের জন্য সময়’ খোঁজার গল্পগুলো নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের এই বিশেষ আয়োজন- 

db0a85c9-2bc4-49bd-b084-2e9ea774db21

সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশই আসল: মালিহা 

আর্থিক স্বাধীনতা থাকলেও কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে নিজের জন্য সময় বের করাটা কিছুটা বিলাসিতাই বটে। তবে এটি একেবারেই অসম্ভব নয় বলে মনে করেন বিসিএস কর্মকর্তা মালিহা। তিনি বলেন, "পুরো বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে আশেপাশের মানুষদের সহযোগিতার ওপর। কর্মজীবী নারীকে অফিস ও সংসার দুটি জায়গাতেই সমান মনোযোগ দিতে হয়। এক্ষেত্রে জীবনসঙ্গী, শাশুড়ি বা বাবা মায়ের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে নিজের জন্য সময় বের করা বেশ সহজ হয়ে যায়।"

মালিহা আরও বলেন, "সবক্ষেত্রে নিখুঁত হতে গিয়ে অনেকে অযথাই মানসিক চাপ নিয়ে ফেলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাগ্যবতী, কারণ কর্মক্ষেত্রে সুন্দর পরিবেশের পাশাপাশি সংসারেও মাতৃতুল্য শাশুড়ির সমর্থন পাচ্ছি। আমি সবকিছুতে নিখুঁত হতে চাই না, একটু সময় পেলেই নিজের পছন্দের কাজ আঁকাআঁকি করি।"

31e3a86e-fa61-4f1b-8555-591c26d8b37d

দায়িত্ব পালনের মাঝেই আনন্দ: শাম্মী 

কথাসাহিত্যিক শাম্মী তুলতুলের দৃষ্টিভঙ্গি আবার কিছুটা ভিন্ন। তার মতে, নারীর নিজের জন্য সময় বের করাটা নিছক বাস্তবতা, কোনোভাবেই বিলাসিতা নয়। তিনি বলেন, "আমার আশেপাশে যা কিছু আছে, সবকিছুতেই আমার অস্তিত্ব জড়িয়ে। বাবা মা, সন্তান কিংবা স্বামীর জন্য আমি যা করছি, তার সবখানেই আমি আছি। চাকরি করছি নিজেরই স্বার্থে।"

নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ ও ভালো রাখার জন্যই এই সময়টা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, কিছু মানুষ সংসার ও সমাজকে অযথাই কঠিনভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, "নারী মানেই সমাজ, নারী মানেই পরিবার ও বাস্তবতা। নিজের সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই নারী তার সুন্দর সময় পার করেন।"

d4c61a75-68b7-425b-8219-665d73fe15de

ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই শক্তির উৎস: শিমু 

ঔপন্যাসিক আহমেদ শিমু মনে করেন, নিজের জন্য সময় কথাটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও অনেক নারীর জীবনে তা সহজে মেলে না। তিনি বলেন, "আমাদের সমাজে একজন নারীর দিন শুরু হয় অন্যদের প্রয়োজন দিয়ে এবং শেষ হয় দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। এর মাঝে নিজের জন্য আলাদা সময় বের করা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বিলাসিতাই মনে হয়।"

তবে নারী যে শুধু দায়িত্ব পালনের যন্ত্র নন, তারও যে নিজস্ব অনুভূতি ও ক্লান্তি আছে, সেটি মনে করিয়ে দেন শিমু। তিনি বলেন, "দিনের ব্যস্ততার মাঝেও অনেক নারী ছোট ছোট মুহূর্তে নিজের জন্য সময় খুঁজে নেন। এক কাপ চা নিয়ে নিরিবিলি বসা, বইয়ের কয়েকটা পাতা পড়া বা পছন্দের কোনো কাজ করা। এই সামান্য সময়টুকুই মানসিকভাবে নতুন শক্তি জোগায়। পরিবার ও সমাজ এই প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিলে এটি স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।"

254302ee-4b31-4d24-a94d-a51eba784e33

মানসিক শান্তির জন্য এটি প্রাপ্য: দিশা 

স্কুল শিক্ষিকা দিশা জাহানের মতে, নিজের জন্য সময় বের করা বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি বড় প্রয়োজন। তিনি বলেন, "আমাদের সমাজে প্রায়ই ভাবা হয় নারীর জীবন শুধু দায়িত্বের মাঝেই সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি। সবকিছু সামলাতে গিয়ে তারা দিনের পর দিন নিজেকেই ভুলে থাকেন।"

দিশা মনে করেন, নারীদের জীবনে সত্যিকার অর্থে হয়তো কোনো অবসর নেই। তবে একজন নারী যখন নিজের জন্য একটু সময় রাখেন, তখন তিনি শুধু নিজের নয়, চারপাশের মানুষদের প্রতিও আরও ইতিবাচক হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, "শান্ত মন আর পরিপূর্ণ একজন মানুষই পারেন অন্যদের জন্য ভালো কিছু করতে। তাই নিজের জন্য একটু সময় রাখা নারীর প্রাপ্য, এটি তার আত্মসম্মান, মানসিক শান্তি আর নিজের অস্তিত্বকে ভালোবাসার এক নীরব প্রকাশ।"

দিনশেষে প্রতিটি নারীর গল্প আলাদা। কারো কাছে নিজের জন্য একটু সময় বের করাটা প্রতিদিনের ছোট ছোট সংগ্রামের নাম। আবার কারো কাছে প্রিয়জনদের ভালো রাখার মাঝেই লুকিয়ে থাকে নিজের প্রশান্তি। তবে আসল সত্যিটা হলো, একজন নারী যখন মানসিকভাবে ভালো থাকেন, তখন তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো পরিবার ও সমাজে।

তাই নিজের জন্য কিছুটা সময় চাওয়া কোনো স্বার্থপরতা বা বিলাসিতা নয়। এটি একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংসার আর কর্মক্ষেত্রের সব দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রতিটি নারী নিজেকেও ভালোবাসতে শিখুক। তাদের এই একান্ত নিজস্ব সময়টুকু নিশ্চিত করতে সবার আগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক পরিবার ও সমাজ।

এনএম