লাইফস্টাইল ডেস্ক
১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:২০ এএম
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে এক ক্লিকে পৃথিবীর হাজারো মানুষের সাথে যোগাযোগ সম্ভব। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— এই সহজ যোগাযোগের যুগেই মানুষ সবচেয়ে বেশি একা। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে ছবি, নিখুঁত জীবনের গল্প এবং ফিল্টারের আড়ালে সাজানো সাফল্যের প্রদর্শনী— সব মিলিয়ে জন্ম নিচ্ছে এক নীরব মহামারি। মানসিক ক্লান্তি ও একাকীত্ব।
বাস্তব জীবনে যতটা দেখা যায় না, সোশ্যাল মিডিয়ায় ততটাই দেখানোর প্রতিযোগিতা। যা প্রকাশিত হয়— তার বড় অংশই সত্য-মিথ্যার মিশে সাজানো স্ক্রিপ্ট। ফলাফল, মানুষ নিজের জীবনকে অন্যের সাথে তুলনা করে হতাশ হয় এবং ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ে।

লাইক, কমেন্ট, রিল— সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি ইন্টারঅ্যাকশন মস্তিষ্কে ডোপামিন বাড়ায়। এতে মুহূর্তিক আনন্দ আসে। যেমন সিগারেট, ফাস্ট ফুড বা অন্য যেকোনো আসক্তিতে হয়। কিন্তু এই আনন্দ অস্থায়ী। এই ছোট ছোট সুখের পেছনে বারবার দৌড়াতে গিয়ে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
দিনের শেষে দেখা যায় মাথা ভার লাগে, মন খারাপ থাকে, সিদ্ধান্তহীনতা বাড়ে, কাজের ইচ্ছা কমে যায়। গবেষণায় প্রমাণিত, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ব্রেন রট এবং মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই নিজের সাজানো সুখ, সফলতা, আনন্দ দেখায়। ব্যথা, ব্যর্থতা, হতাশা—এসব কেউ দেখাতে চায় না। ফলে এক ধরনের সমষ্টিগত বিভ্রম তৈরি হয়- ‘সবার জীবন এত সুন্দর, শুধু আমারটায় সমস্যা।’
ঠিক এখান থেকেই জন্ম নেয় একাকীত্ব। মানুষ মনে করে— আমি একাই পিছিয়ে। এই তুলনা ও নিঃসঙ্গতার চক্রেই তৈরি হচ্ছে নীরবে ছড়িয়ে পড়া Silent Loneliness Epidemic। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু যারা পোস্ট করে তারাই নয়, প্যাসিভ দর্শকরাও একাকীত্বে আক্রান্ত হয়।

সোশ্যাল মিডিয়া ইকোসিস্টেমের চাপ: আজকের ডিজিটাল যুগে সবাই একটি অদৃশ্য চাপের মধ্যে থাকে।
কনটেন্ট বানালে চাপ: ভিউ আসবে তো? কমেন্ট কেমন হবে?
দর্শকদের চাপ: রিল-ভিডিও-খবর-হাইপ—অনেক বেশি। এতে বাস্তব সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। বন্ধুত্ব, পারিবারিক সময়, মন খুলে কথা বলার সংস্কৃতি— সব ধীরে ধীরে কমে আসে। ফলাফল, মানুষ থাকে ভার্চুয়াল ভিড়ের মাঝেও একা।

ডিজিটাল ব্রেক নিন: প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা ফোন ছাড়া থাকুন। এতে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পাবে, মন হালকা হবে।
বাস্তব সম্পর্ক মজবুত করুন: পরিবার ও বন্ধুর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলুন। ১০ মিনিটের আসল সম্পর্ক ১০০টা রিলের চেয়ে মূল্যবান।

তুলনা করা বন্ধ করুন: মনে রাখুন— সোশ্যাল মিডিয়ার ৯০% জীবন সাজানো। নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করে কখনোই ভালো থাকা যায় না।
নিজেকে শুনুন: দিনশেষে একটি প্রশ্ন করুন- আমি কি সত্যি ভালো আছি? দিনের ভালো-মন্দ লিখে রাখুন। এতে নিজের অনুভূতি পরিষ্কার হয়।

প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। এটা দুর্বলতার নয়, সচেতনতার লক্ষণ। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের অংশ— এটা সত্য। কিন্তু তার মোহে পড়ে আমরা যেন নিজের মনকে ভুলে না যাই। মানসিক ক্লান্তি এবং একাকীত্ব নীরবে আমাদের জীবন, কাজ এবং সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে।
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় সাহস হলো— নিজের সত্যিকারের অনুভূতিকে স্বীকার করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া।
লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ
এনএম