লাইফস্টাইল ডেস্ক
১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৩৩ পিএম
পুরুষ হয়ে জন্মানো মানেই যেন জন্মের পর থেকেই একটা অদৃশ্য দায় কাঁধে এসে পড়ে। শক্ত হতে হবে, কম হাসতে হবে, পরিবারের দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে হবে— এমন এক সামাজিক রূপরেখা আমাদেরকে দিনদিন বেশি নীরব করে দেয়। আমাদের সমাজে পুরুষের মানবিক অনুভূতি প্রকাশের অবকাশ খুব কম। যেন তাকে সবসময়ই রুক্ষ, দৃঢ়, অভেদ্য হয়ে থাকতেই হবে। অথচ পুরুষও মানুষ, তারও আনন্দ আছে, ভয় আছে, মন খারাপ আছে, আছে না বলতে না পারা কত শত গল্প।
সমাজের কিছু রীতিনীতি যেন অঘোষিত নিয়ম হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই যেমন- ছেলেদের অশ্রু! ছেলেদের চোখের জল দেখা যেন বারণ। ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, “ছেলে মানে শক্ত, ছেলে কাঁদে না।” ধীরে ধীরে শেখা হয়, কষ্ট পাওয়া যায় কিন্তু বলা যায় না। মন খারাপ হয়, কিন্তু মুখ গোমড়া করা যাবে না।
ফলে যেকোনো কষ্ট, ভয়, অপমান কিংবা মানসিক চাপ সবকিছুই বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে হয়। কেউ যদি দুর্বলতার সামান্য ইঙ্গিতও দেয়, তাকে তাচ্ছিল্য, উপহাস কিংবা অযাচিত উপদেশের মুখোমুখি হতে হয়। এভাবেই শিশু বয়সে আবেগ চেপে রাখা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। যখন বেড়ে উঠি, তখন সেই অভ্যাসই হয়ে দাঁড়ায় স্বভাব।
এভাবে আমরা একদিন বুঝতে পারি, আমাদের দুঃখ প্রকাশ করার ভাষা নেই; চোখে জল আনার অনুমতি নেই; সাহায্য চাইবার ক্ষমতাও যেন সমাজ কেড়ে নিয়েছে। অথচ চোখের জল তো মানুষেরই ভাষা, অনুভবেরই প্রকাশ; সেটা লিঙ্গভেদে বদলায় না। এই অযৌক্তিক নিয়মগুলোই আমাদের সমাজকে সংবেদনশীলতার জায়গায় পিছিয়ে দেয়।
অনেকসময় মনে হয়, পুরুষের পদবি যেন ‘দায়িত্ববান’ বাবা হোক, ভাই হোক, স্বামী হোক কিংবা ছেলে। চাকরি, পরিবার, সামাজিক অবস্থান সবকিছুতেই পুরুষকে ‘সমাধানদাতা’ হিসেবে দেখা হয়। যেন কোনো সমস্যা হলেই পুরুষেরই সামনে এসে দাঁড়াতে হবে; তিনিই পারবেন, তিনিই সামলাবেন। পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া, আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি অন্যদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বও মাথায় নিতে হয়। এতে ভালোবাসা আছে, গর্ব আছে তেমনি আছে প্রচণ্ড চাপও।

পুরুষ হিসেবে দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে সম্মানের, কিন্তু দায়িত্ব মানেই তো নিজের অনুভূতি অস্বীকার করা নয়। দুর্ভাগ্য হলো, সমাজ এমনভাবে আমাদের তৈরি করে যে নিজের যত্ন নেওয়ার কথাই ভুলে যাই। নিজের ক্লান্তি, ভয় বা দুঃখ প্রকাশ করতে গেলেও অপরাধবোধ হয়।
অথচ মানুষ হিসেবে সবারই বিশ্রাম দরকার, সবারই ভরসা দরকার, সবারই কান্না–হাসি সমানভাবে মূল্যবান। সমাজের এই কঠোর ধারণা বদলানো জরুরি— কারণ যতক্ষণ পুরুষের অনুভূতিকে জায়গা না দেওয়া হবে, ততক্ষণ দায়িত্বের ভারই তাকে নীরবে ক্লান্ত করে দেবে।
সম্পর্ক ভাঙলে পুরুষ কি আঘাত পায় না? চাকরি হারালে বা রোজগার কমে গেলে রাতভর চিন্তায় ডুবে যায় না? সবই হয়। হৃদয়ের কষ্ট, ভয়, অনিশ্চয়তা-পুরুষও একইভাবে অনুভব করে। কিন্তু বলা যায় না। কারণ সমাজ এখনো পুরুষের শক্তিই দেখতে চায়, দুর্বলতার সামান্য প্রকাশও গ্রহণ করতে পারে না।
বন্ধুদের সামনেও কথা বলতে গেলেও অনেক সময় অবহেলা শুনতে হয় “এগুলা নিয়ে কাঁদিস কেন?”, “তুই তো ছেলে!” এই ধরনের কথায় ভরসার জায়গাটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। আর কখনো সেই বন্ধু, যে একসময় দুঃখ শোনার সঙ্গী ছিল, সময়ের সঙ্গে সেও একই ব্যথা দিয়ে যায় কিংবা পুরনো কথা শুনিয়ে তাচ্ছিল্য করে। ফলে ধীরে ধীরে গল্পগুলো বুকের ভেতর জমতে থাকে। না বলা কথাগুলো ভারি হতে থাকে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভিতরে নীরবতা ক্রমে মানসিক যন্ত্রণা হয়ে ওঠে।
এই ব্যথার কোনো শব্দ নেই, কোনো অভিযোগ নেই শুধু একটা অদৃশ্য চাপ, যা পুরুষকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিতে থাকে।

সমাজের কোনো পেশাই ছোট নয়; প্রতিটি পেশার কাজই আমাদের নিত্যদিনের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের পাতায় তাকালে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত বৈষম্য- দর্জি, মুচি, কৃষক ইত্যাদি পেশায় পুরুষের ছবি দেখানো হলেও চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষকতা বা মর্যাদাপূর্ণ পেশাগুলোর ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই নারী বা নির্লিঙ্গ প্রতীক দেখানো হয়। যেন অজান্তেই বোঝানো হয় দৈহিক শ্রমের কাজ পুরুষের, আর বুদ্ধিবৃত্তিক বা সম্মানজনক পেশা পুরুষের সঙ্গে এমন জরুরি নয়।
এ বৈষম্য শুধু বইয়ে নয়; দেখা যায় পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সংবাদেও। অধিকাংশ সময় অকৃতকার্য বা হতাশাজনক ফলাফলের ছবিতে ছেলেদেরই দেখানো হয় যেন ব্যর্থতার মুখও শুধু পুরুষের। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিপিএ–৫ পাওয়ার সংবাদে ঘনঘন মন্তব্য ভেসে ওঠে: “ছেলেরা কি কেউ জিপিএ ৫ পায়নি?”
এই একপেশে চিত্র উপস্থাপন করে সমাজ যেন অজান্তেই একটি ক্ষতিকর বার্তা দেয়, সাফল্যের জায়গা নারীর, আর ব্যর্থতার দায় পুরুষের। অথচ বাস্তবতা হলো, সাফল্য–ব্যর্থতা লিঙ্গ দেখে বেছে আসে না। ছেলে–মেয়ে সকলেরই সমানভাবে পারা–না–পারার গল্প আছে, পরিশ্রম আছে, অর্জন আছে।
সময়ের সঙ্গে এসব ধারণা বদলানো জরুরি। কারণ যেদিন সমাজ সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে শিখবে, সেদিনই ছেলেরা ব্যর্থতার প্রতীক নয়, সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবেও দেখা পাবে।

পুরুষের সুখ আসলে খুবই সাধারণ, খুবই নিভৃত। এক কাপ গরম চা, বাবা–মায়ের সামান্য প্রশংসা, বন্ধুদের সঙ্গে নির্ভার হাঁটা—এমন সামান্য মুহূর্তই দিনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারে। আমি নিজেও অনুভব করি, ছোট ছোট আনন্দই জীবনের ভার সবচেয়ে সহজে হালকা করে দেয়।
সন্তানের হাত শক্ত করে ধরা, পরিবারের কারও একটুখানি হাসি, নিজের প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে সফল হতে দেখা—এসব অনুভূতিই পুরুষকে সামনে এগোনোর শক্তি দেয়। অনেকের কাছে এগুলো তুচ্ছ মনে হলেও একজন পুরুষের জন্য এসবই বড় অর্জন, বড় আনন্দের উৎস।
তবুও পুরুষের আনন্দের গল্প খুব কম শোনা যায়। কারণ তারা বলতেই শেখেনি—সমাজ তাদের কষ্ট চেপে রাখতে শিখিয়েছে, আবার খুশিও প্রকাশ করতে ভুলিয়ে দিয়েছে।
বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা একাকিত্ব কার নেই? একজন পুরুষের জন্যও এসব বাস্তব এবং স্বাভাবিক অনুভূতির অংশ। তবু সমস্যার সময় সাহায্য চাইতে গেলেই অনেকের চোখে তা দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ যেন ধরে নিয়েছে, মানসিক চাপও পুরুষকে নিঃশব্দে সহ্য করতে হবে। দুর্ভাগ্য হলো, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হয় পুরুষরাই।

আজকের সমাজ বদলাচ্ছে। কিন্তু পুরুষকে ঘিরে প্রত্যাশাগুলো এখনও খুব পুরনো। শক্ত হতে হবে, হাসতে হবে, দুঃখ চেপে রাখতে হবে এই ধারণাগুলো ভাঙা জরুরি।
পুরুষত্ব মানে শুধু শক্তি নয়- স্নেহ, দায়িত্ব, সততা, সংবেদনশীলতা সবই পুরুষত্বের অংশ। পুরুষ যদি অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে, নিজের আনন্দ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারে তাহলেই সমাজ আরও মানবিক হবে।
আমাদের পরিবার, কর্মস্থল, বন্ধুমহল সব জায়গাতেই পরিবর্তন দরকার। পরামর্শ, উৎসাহ ও প্রশংসা শুধু নারীর জন্য নয়; পুরুষও এগুলোর প্রাপ্য।
এককথায় পুরুষত্বের মানদণ্ড পরিবর্তন করলে সম্পর্কগুলো আরও সুন্দর, সুস্থ ও সমান হবে।
পুরুষ হওয়া মানে দুর্বলতাকে চেপে রাখা নয়; দায়িত্বের সঙ্গে অনুভূতিকে বোঝা। পুরুষও মানুষ তারও স্বপ্ন আছে, ভয় আছে, ক্লান্তি আছে, হাসি আছে। সমাজ যদি পুরুষের নীরবতাকে ভাঙতে শেখে, তবে পরিবার আরও বন্ধনময় হবে, সম্পর্ক আরও উষ্ণ হবে।
লেখক: পরিচালক, ফুলবাড়ীয়া আইসিটি ট্রেনিং ইন্সটিটিউট এবং গণমাধ্যমকর্মী
এনএম