images

লাইফস্টাইল

বাগান বিলাসের রঙিন আভায় নতুন প্রাণের স্পন্দন

ফিচার ডেস্ক

০১ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩০ পিএম

ফুল মানেই সৌন্দর্যের প্রতীক। রঙ, হাসি আর মুগ্ধতার কারণ। চারপাশে অসংখ্য ফুলের ভিড়ে কিছু ফুল থাকে যেগুলো শুধু রঙের বাহারে নয়, নিজেদের স্বতন্ত্র উপস্থিতি দিয়েও আমাদের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়। তেমনই এক অনন্য ফুল হলো বাগান বিলাস।

কাষ্ঠল লতা জাতীয় এই উদ্ভিদ অনেকের কাছে পরিচিত ‘কাগজ ফুল’ নামে। কারণ, এর ফুল দেখতে অনেকটা রঙিন কাগজের পাতার মতো। কেউ কেউ একে ‘গেটফুল’ বলে ডাকেন, যেহেতু বাড়ির গেট সাজানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। এর ইংরেজি নাম Bougainvillea, যা এসেছে ফরাসি নাবিক লুইস অটোইন ডি বোগেনভিল-এর নাম থেকে। ১৮ শতকে ব্রাজিল ভ্রমণের সময় তিনিই প্রথম এই রঙিন ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তাঁর নামেই ফুলটির নামকরণ হয়। আর বাংলায় এর নাম ‘বাগান বিলাস’ দিয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

bougian1

বৈজ্ঞানিকভাবে এর নাম Bougainvillea spectabilis। নাম যাই হোক, এর রঙিন বাহার আর সহজ প্রাপ্যতা একে সবার কাছে আপন করে তুলেছে।

দূর থেকে তাকালে বাগান বিলাসকে মনে হয় যেন রঙের আগুন ঝরছে। গাঢ় গোলাপি, হালকা বেগুনি, লাল, কমলা, সাদা কিংবা মিশ্রিত নানা রঙে ফুলটি শোভা ছড়ায়। প্রতিটি ঝোপ যেন শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো। শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, কলেজ ক্যাম্পাস কিংবা কোনো বারান্দা—যেখানেই বাগান বিলাস ফুটে ওঠে, সেখানেই একধরনের উৎসবের আবহ তৈরি হয়।

f7e0ff63-74c5-4a30-982b-a20b73cee403

বিশেষ করে শহরের ধূসর কংক্রিট দেয়াল যখন শুষ্ক হয়ে ওঠে, তখন এই ফুল যেন নতুন প্রাণ এনে দেয়। প্রকৃতির টান অনুভব করার জন্য ব্যালকনির কোণায় একটি টব ভর্তি বাগান বিলাসই যথেষ্ট।

বাগানপ্রেমীদের কাছে বাগান বিলাসের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর যত্ন সহজ হওয়া। আলাদা করে প্রচুর যত্নের প্রয়োজন নেই। খরা সহনশীল এই গাছ শহরের ধুলোবালিময় পরিবেশেও সহজে বেড়ে ওঠে। ফ্ল্যাট, হোস্টেল বা ছোট ব্যালকনির বাগানে যারা সীমিত জায়গায় সবুজের স্বাদ খোঁজেন, তাদের তালিকায় বাগান বিলাস প্রায় সবার উপরে। এটি টব, ঝোপ বা দেয়াল বেয়ে ওঠা লতার মতো—যেভাবেই লাগানো হোক না কেন, সহজেই মানিয়ে নেয়।

bougain2

অন্যান্য ফুলের মতো নির্দিষ্ট ঋতুর ওপর নির্ভরশীল নয় বাগান বিলাস। প্রায় সারা বছর ধরেই এটি ফুল ফোটায়। তবে শীত আর বসন্তে এর রঙের বাহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই কারণেই শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস, পার্ক, রিসোর্ট কিংবা রাস্তাঘাটে সর্বত্র এর উপস্থিতি নজরে পড়ে।

বাগান বিলাস শুধু চোখ জুড়ানোর জন্যই নয়, এর রয়েছে নানা উপকারিতাও। এই ফুল সেদ্ধ করে পান করলে কাশি ও সর্দি-জ্বর কমাতে সাহায্য করে। অনেকেই বাগান বিলাস দিয়ে ভেষজ চা তৈরি করে থাকেন, যা কোলেস্টেরল কমাতে কার্যকর। পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে যখন সর্দি-কাশি বেড়ে যায়, তখন এই ফুলের পানীয় প্রাকৃতিক প্রতিকার হিসেবে কাজ করে।

23734321-cc5d-44a9-a204-2cb7d4076b6c

এছাড়া, বাগান বিলাস প্রজাপতি ও মৌমাছিকে আকর্ষণ করে, যা জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ফলে কেবল সৌন্দর্য নয়, পরিবেশ রক্ষাতেও এর অবদান রয়েছে।

শুধু বাড়ির টবেই নয়, পার্ক, রিসোর্ট, স্কুল-কলেজের গেট, অফিসের প্রবেশদ্বার—সব জায়গাতেই বাগান বিলাস সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয়। দেয়াল বেয়ে ওঠার ক্ষমতার কারণে এটি প্রাকৃতিক পর্দার মতো কাজ করে, যা শহরের ঘিঞ্জি জায়গায় বাড়তি একধরনের নান্দনিকতা যোগ করে। যারা বাড়ির চারপাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আনতে চান, তাদের জন্য বাগান বিলাস নিঃসন্দেহে সেরা পছন্দ হতে পারে।

bougain3

আজকের দিনে শহরের কংক্রিট দেয়াল আর ছাদগুলো যখন ক্রমশ সবুজ হারাচ্ছে, তখন বাগান বিলাস যেন এক টুকরো রঙিন স্বস্তি। এটি শুধু সৌন্দর্য ছড়ায় না, বরং মানুষের মনে আনন্দের রঙও যোগ করে। ধূসর জীবনে ছোট্ট এক কোণায় বাগান বিলাসের ঝাড় যেন নতুন করে বাঁচার ইঙ্গিত দেয়।

ফুলের সৌন্দর্য মানুষের মনে আশ্রয় খুঁজে নেয়। বাগান বিলাস সেই সৌন্দর্যের এক জ্যান্ত উদাহরণ। এর উপস্থিতি শুধু চোখের আনন্দ নয়, জীবনের ধূসর দিনেও রঙের ঝরনা এনে দেয়। কংক্রিটের নগরে যখন প্রকৃতির ছোঁয়া কমে যায়, তখন বাগান বিলাস যেন নীরবে মনে করিয়ে দেয়- ‘রঙ হারিয়ো না, হাসি ভুলো না।”

এনএম