images

লাইফস্টাইল

সমুদ্র-ঝর্ণা-নদীর কাছে গেলে মন শান্ত হয়ে যায় কেন?

লাইফস্টাইল ডেস্ক

১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৪:১৩ পিএম

ক্লান্ত দেহে কানে হেডফোন গুঁজে হয়তো অনেকবারই শুনেছেন, মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠে- ‘আমি কখনো যাইনি জলে/ কখনো ভাসিনি নীলে/ কখনো রাখিনি চোখ/ ডানামেলা গাঙচিলে’। ব্যস্ত জীবনে নীল জলরাশির কাছাকাছি যাওয়ার সময় আমাদের খুব একটা হয় না। তবুও সময় সুযোগ পেলেই অনেকে চলে যান সমুদ্র কিংবা ঝর্ণার কাছে। খেয়াল করে দেখেছেন হয়তো সমুদ্রের কাছাকাছি গেলে মনটা অজান্তেই শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু কেন এমন হয়? জানলে অবাক হবেন, কেবল আপনি নন, অসংখ্য ব্যক্তিরও মন ভালো হয় এমন জায়গায় গেলে। 

হৃদ, সমুদ্র এমনকি কৃত্রিম ঝর্ণার কাছে গেলেও মন শান্ত লাগে। যেসব জায়গায় গেলে এমন প্রশান্তিদায়ক প্রভাব কাজ করে তাকে বিশেষজ্ঞদের ভাষায় ব্লু স্পেস বলা হয়। এই ব্লু স্পেস বা নীল স্থানের তালিকায় রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র, প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট জলাশয়, শান্ত কিংবা উদ্দাম স্রোতের নদী থেকে শুরু করে শহরের কৃত্রিম ঝর্ণা। 

water1

একইভাবে বন, পাহাড়, পার্কের মতো জায়গাগুলোকে বলা হয় গ্রিন স্পেস। কিন্তু এসব সবুজ স্থানের তুলনায় নীল স্থানগুলো আমাদের ইন্দ্রিয়কে বেশি উদ্দীপিত করে তোলে। আছড়ে পড়া তরঙ্গ, পানিতে আলোর ঝিকিমিকি প্রতিফলন অথবা শীতল পানির স্পর্শের অনুভূতির কথা ভাবলেই তা বোঝা যাবে।

ব্লু স্পেস কী?

ব্লু স্পেস বা নীল স্থান বলতে পানিঘেরা যেকোনো পরিবেশকে বোঝায়। হতে পারে সেটি প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট। এর মধ্যে আছে সমুদ্র, নদী, হ্রদ, পুকুর, খাল, এমনকি কৃত্রিম ঝর্ণাও। কেন না পানি তার প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং এই ধরনের ঝর্ণা কৃত্রিম হলেও ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপিত করে থাকে।

beach1

২০২০ সালে প্রকাশিত এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় (এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দ্বারা) দেখা যায় যে এসব স্থানে গেলে অন্যরকম অনুভূতি হয়। যেমন তরঙ্গের শব্দ শোনা বা স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ নেওয়া, যা সবুজ স্থান থেকে আলাদা। শহুরে খাল বা ফোয়ারাগুলোও নীল স্থান হতে পারে যদি সেগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার, নিরাপদ এবং সংবেদনশীলতায় সমৃদ্ধ হয়।

ভূগোলবিদ ক্যাথেরিন কেলি তার ২০২১ সালে লেখা বই ‘ব্লু স্পেসেস: হাউ অ্যান্ড হোয়াই ওয়াটার ক্যান মেক ইউ ফিল বেটার’-এ এগুলোকে থেরাপিউটিক ল্যান্ডস্কেপ বলে অভিহিত করেছেন।

beach2

এই লেখক মায়োর পাথুরে তীরে প্রায় সাত বছর কাটিয়েছেন। যেখানে তিনি তার মাকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে নিয়মিত সমুদ্রে সাঁতার কাটতেন। তার মতে, পানি ঘেরা পরিবেশ আমাদের প্রশান্তি দিতে পারে অথবা মানসিক শক্তি যোগাতে পারে। স্রোতময় সমুদ্র হোক কিংবা স্থির পুকুর— নীল স্থান আমাদের দৃষ্টি, শব্দ ও স্পর্শের মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ্য করে তোলে। অর্থাৎ নীল জলরাশি শরীর ও মন উভয়ের ওপরই ইতিবাচক প্রভাব রাখে।

ব্লু হেলথ কী?

নীল স্থানগুলো যে কেবল দেখতেই সুন্দর এমনটা নয়; এগুলো আমাদের শরীর ভালো রাখে। মেজাজেরও উন্নতি ঘটায়। এই সামগ্রিক ভালো থাকার প্রক্রিয়াকেই ব্লু হেলথ বা নীল স্বাস্থ্য বলা হয়। ২০২০ সালের পরিবেশগত গবেষণা অনুযায়ী, নীল জলরাশিযুক্ত পরিবেশের সঙ্গে চাপ হ্রাস, উন্নত শারীরিক সুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে।

ব্লু স্পেসের কাছাকাছি থাকলে স্বাস্থ্যে সামগ্রিক উন্নতি অনুভব করা যায়। যা পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় নীল স্বাস্থ্যকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

water

শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্লু স্পেসের ভূমিকা

ব্লু স্পেস স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক কার্যকলাপকে উৎসাহিত করে। হোক সেটি নদীর ধারে হাঁটা, হ্রদে সাঁতার কাটা, খালের মধ্য দিয়ে নৌকোর প্যাডেল চালানো, সমুদ্র সৈকতে বসে থাকা কিংবা অন্যকিছু। এই কার্যকলাপগুলো হৃদপিণ্ড ভালো রাখতে, মেজাজ উন্নত করতে এবং চিন্তাভাবনাকে সুতীক্ষ্ণ করতে সাহায্য করে।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত ২০১৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, পার্ক বা জিমের তুলনায় নীল জায়গায় মানুষ বেশি সময় নিয়ে ব্যায়াম করে। কেন? কারণ হিসেবে দেখা গেছে, পানির শান্ত প্রভাব আমাদের শারীরিক সক্রিয়তাকে প্রভাবিত করে। তাই, আমরা নিজেদের অজান্তেই আরও বেশি নড়াচড়া করি।

sea

মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্লু স্পেসের ভূমিকা 

ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে অনেকেরই মন শান্ত হয়ে যায়। ২০২১ সালের সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে উপকূলের কাছাকাছি বসবাস মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সমুদ্র, নদী বা ঝর্ণার পাশে থাকলে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং মানসিক চাপের হার কমে।

এটি মনোযোগ পুনরুদ্ধার নামের একটি ধারণার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের জার্নাল অফ ইমেজিং পেপারে এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। মূলত, পানির মৃদু নড়াচড়া- যেমন ঢেউ বা প্রবাহিত স্রোত, এক ধরনের শান্ত মুগ্ধতা তৈরি করে।

water2

এটি আমাদের মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি না করেই মনোযোগ আকর্ষণ করে, আমাদের মানসিকভাবে পুনরায় সুসংহত এবং রিচার্জড হতে সাহায্য করে।

২০২৫ সালের নেচার কমিউনিকেশনস-এর একটি গবেষণায় এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা যায়, ভার্চুয়াল হ্রদের দৃশ্যের সংস্পর্শে আসা অংশগ্রহণকারীরা হালকা বৈদ্যুতিক শক গ্রহণের সময় কম ব্যথা অনুভব করেছিলেন এবং শহুরে পরিবেশ দেখার সময়ে তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ কম ছিল। এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসা যায় যে পানির বয়ে চলার দৃশ্য ও শব্দ মানসিক চাপ এবং অস্বস্তি কমাতে পারে। 

water4

এখানেই শেষ নয়। এসব ব্লু স্পেস ইতিবাচক আবেগকেও জাগিয়ে তোলে। বিশাল হ্রদ কিংবা জলপ্রপাতের দিকে তাকালে দৈনন্দিন উদ্বেগ থেকে মনোযোগ বড় কিছুতে সরে যায়। জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল সাইকোলজিতে ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্র বা বিশাল হ্রদের সামনে গেলে মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। এই বিস্ময় মানসিক চাপ কমাতে এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে সাহায্য করে। ব্লু স্পেস সুখস্মৃতি জাগাতেও সাহায্য করে। 

সবমিলিয়ে বলা যায়, সমুদ্র, হ্রদ, ঝর্ণা কিংবা শহরের পাশে বয়ে চলা কোনো নদী— সবই মানুষের মনে ভালোলাগার অনুভূতি এনে দেয়। চিন্তার পরিধিকে বিস্তৃত করে। তাই যান্ত্রিক জীবনের ফাঁকে একটু ছুটি মিলিয়ে ঘুরে আসুন সমুদ্র কিংবা নদীর পাড় থেকে। মন ভালো হবে, কাজেও উৎসাহ পাবেন।

এনএম