লাইফস্টাইল ডেস্ক
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:০৪ পিএম
আনন্দের খবর হোক কিংবা উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা দাওয়াত— সঙ্গে মিষ্টি থাকা চাই। মিষ্টি মুখের রীতি বহু পুরনো। বাহারি সব মিষ্টির স্বাদে তৃপ্তি মেলে ভোজনরসিকদের। স্বাদের মতো নামেও রয়েছে বৈচিত্র্য। রসগোল্লা, কালোজাম, চমচম, সন্দেশ, লাড্ডু, কাঁচাগোল্লা, মণ্ডা, রাজভোগ— নামের যেন শেষ নেই।
এমনই একটি মজার মিষ্টি ল্যাংচা। আমাদের দেশে খুব একটা পরিচিত না হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এই মিষ্টি বেশ জনপ্রিয়। একধরণের রসের মিষ্টি এটি। এর রঙ কালচে বাদামী। ল্যাংচার উৎপত্তিস্থল পশ্চিমবঙ্গের শক্তিগড়। এর স্বাদ অনেকটা আমাদের কালোজামের মতো।

ল্যাংচার নামকরণের ইতিহাস
ল্যাংচার উৎপত্তি ও নামকরণ নিয়ে মতভেদ আছে। শোনা যায়, কৃষ্ণনগরের রাজকন্যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বর্ধমানের রাজপুত্রের। বিয়ের কিছুদিন পর রাজকুমারী অন্তঃসত্ত্বা হলে কৃষ্ণনগরের রাজা কন্যাকে নিয়ে আসেন আপন গৃহে। সবার মনে আনন্দ নতুন অতিথির আগমন ঘিরে। এরমধ্যেই রাজবাড়িতে তৈরি হয় এক বিপত্তি। রুচি হারিয়ে ফেলে রাজকন্যা।
কিছুই মুখে রোচে না তার। রাজবাড়ির লোভনীয় রাজভোগও তার কাছে বিস্বাদ লাগে। কন্যার এমন অবস্থা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়লেন রাজা। হাকিম কবিরাজ সবাই এলো। রোগ আর সারে না। এরপর একদিন রাজকন্যা নিজেই বাবাকে ডেকে বললেন, তিনি বর্ধমানে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে এক ময়রার হাতে তৈরি কালো রঙের ভাজা মিষ্টি রসে ডুবিয়ে খেয়েছিলেন। সেই মিষ্টি খেলেই নাকি তার মুখের রুচি ফিরবে।

সমস্যা হলো ময়রার নামও জানেন না রাজকন্যা। কেবল এতটুকু মনে আছে যে সেই ময়রার এক পা খোঁড়া ছিল। সেই ময়রাকে খুঁজে আনতে বর্ধমানে দলবল পাঠালেন রাজা। অবশেষে তাকে খুঁজে নিয়ে আসা হল কৃষ্ণনগরের রাজবাড়িতে। তিনি রাজকন্যার জন্য বানালেন এক ভাজা মিষ্টি। যা রসে ভিজিয়ে নরম করে পরিবেশন করলেন রাজকন্যার জন্য। শুধু রাজকন্যাই না মিষ্টির স্বাদে মজে গেলেন স্বয়ং রাজাও।
রাজকন্যা মিষ্টি খেয়েই সুস্থ হয়েছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। কিন্তু মিষ্টির নাম কী তা কেউই জানতেন না। অবশেষে সেই ময়রা, যিনি মিষ্টি বানিয়েছিলেন তিনি যেহেতু ল্যাংচিয়ে হাঁটেন তাই তার নামেই এই মিষ্টির নাম হলো ল্যাংচা।

রাজা খুশি হয়ে সেই ময়রাকে দেন প্রচুর উপহার। কৃষ্ণনগর থেকে বর্ধমানে ফিরে শক্তিগড়ে ল্যাংচার দোকান দেন তিনি। শুধু ল্যাংচা মিষ্টিই বিক্রি করতে শুরু করলেন। বহু যুগ পেরিয়েছে। সেই ময়রা আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার তৈরি ল্যাংচা এখনও বিখ্যাত।
কীভাবে তৈরি হয় ল্যাংচা?
ছানার সঙ্গে প্রথমে ময়দা ও চালের গুঁড়ি ভালো করে মেশানো হয়। গুণগত মান ও স্বাদ বাড়াতে দেওয়া হয় খোয়া ক্ষীর। মিশ্রণটিকে ল্যাংচার আকার দিয়ে প্রথমে ভেজে নেওয়া হয় ডুবো তেলে। তারপর রসে ভিজিয়ে রাখা হয়। সঠিক মাপে, সঠিক উপাদানে তৈরি হয় ল্যাংচা।

কবে থেকে জনপ্রিয় হলো এই মিষ্টি?
এর পেছনেও রয়েছে এক ইতিহাস। লর্ড কার্জন এই মিষ্টির সুখ্যাতি করেছিলেন। তবে বলা হয়, জন্মলগ্ন থেকে এখনো পর্যন্ত একইভাবে সবার মন জয় করে আসছে শক্তিগড়ের ল্যাংচা।
ঘরে ল্যাংচা তৈরির রেসিপি
ল্যাংচা বানাতে লাগবে গুঁড়ো দুধ, সুজি, ময়দা, বেকিং পাউডার। প্রথমে ১ কাপ গুঁড়ো দুধ, ২ চামচ সুজি, ২ চামচ ময়দা, হাফ চামচ বেকিং পাউডার একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এবার তা দুধ দিয়ে খুব ভালো করে মথে নিন। এই মিশ্রণ খুব বেশি টাইট হবে না।

এবার মণ্ড থেকে ল্যাংচার আকারে মিষ্টি গড়ে নিন। চুলায় কড়াই বসিয়ে তেল দিন। ডুবো তেলে ল্যাংচা ভেজে নিন।
অন্য একটি পাত্রে পানি আর চিনি মিশিয়ে সিরা করে নিন। এর মধ্যে এলাচ গুঁড়ো মেশান। মাঝারি আঁচে জ্বাল দিন। ফুটে উঠলে ল্যাংচাগুলো ছেড়ে দিন। এভাবে ১০ মিনিট ঢেকে রাখলেই ল্যাংচার মধ্যে রস প্রবেশ করবে। গ্যাস বন্ধ করে ৫ মিনিট রেখে দিলেই তৈরি ল্যাংচা। এবার খাওয়ার পালা।
বর্তমানে শক্তিগড় হয়ে উঠেছে ‘ল্যাংচার আঁতুড়ঘর’। চারপাশের সবকিছু বদলে গেলেও জনপ্রিয়তায় আজও ভাঁটা পড়েনি। এখনও সবাই মুগ্ধ হন রসে ডোবা ল্যাংচার স্বাদে।
এনএম