মোস্তফা ইমরুল কায়েস
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৪৮ পিএম
রহিমা বেগম (৫৩)। পড়ালেখা করেননি জীবনেও। পুরাই নিরক্ষর। আয় ইনকামের উৎস নেই। কিন্তু ব্যাংকে তার কাড়ি কাড়ি টাকা। দেশের পাঁচ বেসরকরি ব্যাংকে প্রায় ২১ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকার উপরে লেনদেনের সন্ধ্যান মিলেছে। আছে বহুতল ভবন। নামে বেনামে আরও অনেক টাকার সম্পত্তি। এমনই বিস্ময়কর তথ্য বেড়িয়ে এসেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুসন্ধানে।
মাদক বিক্রি ও পাচারের মাধ্যমে এই টাকা ও সম্পত্তির পাহাড় গড়েছেন রহিমা। এসব সম্পত্তির তথ্য পাওয়ার পর মানিলন্ডারিং মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাজধানীর ওয়ারী থানায় মামলাটি হয় বলে থানা সূত্র জানায়। ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মাদক বিক্রি করে এই টাকা ও সম্পত্তির পাহাড় গড়েছেন বলে জানিয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। কিন্তু এই রহিমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানি লন্ডারিংয়ে মামলায় তাকে পলাতক উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদক ব্যবসায়ী রহিমাকে অভিযোক্ত করে মামলাটি করেছেন রংপুরের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক আলী আসলাম হোসেন। তিনি রহিমাকে খুঁজে না পেয়ে পলাতক হিসেবে মামলায় উল্লেখ করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা প্রমাণ পেয়েছেন, এই রহিমার আয়কর হিসেবে ২০১৮-১৯ সাল অবধি মাত্র সাড়ে ১৯ লাখ টাকার সম্পত্তি দেখানো হয়েছে। কিন্তু তার ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আয়করের তথ্যে গোপন করা হয়েছে। রহিমার বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব
রহিমা হতদরিদ্র হলেও তার রাজধানীর রুপালী ব্যাংক হাটখোলা শাখা, ঢাকার লোকাল অফিস সোনালী ব্যাংক শাখা, ফতুল্লার সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলের ডাচ-বাংলা ব্যাংক শাখা, দনিয়া এলাকার রায়েরবাগ যমুনা ব্যাংক শাখা ও চাঁদপুর জেলার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. শাখায় তার নামে ২১ কোটি টাকার সন্ধ্যান মিলেছে। এই টাকাগুলো সে ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ থেকে শুরু করে ২০২১ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে লেনদেন করেছে। রহিমা শুধু নিজের নামেই ব্যাংকে হিসাব খোলেনি। তার নাবালক ছেলে জাহিদ হোসেন শুভ’র নামেও ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
সেই হিসাবগুলোতেও তার কোটি কোটি টাকার সন্ধ্যান পেয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এছাড়াও এই রহিমা ছেলের নামে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন দাগে জমি কিনেছে।
জানা গেছে, রহিমার নামে খোলা রাজধানীর হাটখোলা বাজারে রুপালী ব্যাংকের শাখায় ছয়টি হিসাবে খোলা আছে। সেগুলো হলো- হিসাব নং- ০২০৮০১০০০৮৪৮১, ২০৮০৪৩০০০০১০, ২০৮০৩৫০০৪৭৩৬, ২০৮০১০০০৯১১০, ২০৮০১৫০০০০১২ ও ১৫০০০০১২৯। সোনালী ব্যাংক ঢাকা লোকাল শাখায় হিসেবে নম্বর ০০০২৬৩৪২৯৩৮৯৭, নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা সিদ্ধিরগঞ্জের সিমরাইলে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দুটি হিসাবে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের হিসাব নং-১২৮১১০০০২৬০৭৫ ও ১২৮১০১০৩৪৭৪৮৮। দনিয়ার জনতাবাগ এলাকার যমুনা ব্যাংকের রায়ের বাগ শাখায় দুটি হিসেবে। হিসাব নম্বর হলো- ৫৩০৩১০০৫০০৪৬ ও ৫৩০৩১০০৫০০৩৭। এছাড়াও চাঁদপুর জেলার ইসলামী ব্যাংক শাখায় হিসাব নম্বর- ২০৫০১৩৪০২০৪৮৯২১০১।
মাদকের টাকায় রহিমার যতো সম্পত্তি
মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে রহিমা তার নিজের নামে নারায়ণঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুরের ভুঁইঘরে প্রায় পাঁশ শতক জমি কিনে আট তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। রাজধানীর সবুজবাগ এলাকার মেরাদিয়ায় সাড়ে তিন কাঠা, নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জের খোর্দঘোষ পাড়ায় ৫৫ লাখ টাকায় সাড়ে সাত শতাংশ জমি এবং নাবালক ছেলে জাহিদ ও জীবনের নামে একই এলাকায় মাদরানা রোডে কিছু জমির সন্ধানও পাওয়া গেছে।
কে এই রহিমা
মামলা সূত্রে জানা গেছে, এই রহিমা থাকেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভুঁইফোঢ় এলাকার মাহমুদপুর গ্রামে। তার স্বামীর নাম হযরত আলী। রহিমার বাবার নাম শহীদ মাতবর। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা শরীয়তপুরের রাজৈর উপজেলার মঠবাড়ির আমগ্রামে। কিন্তু সে রাজধানীর ওয়ারী এলাকার গেন্ডারিয়া ১১৫/৮, ডিস্টিলারী রোডেও বসবাস করে।
এই রহিমা বেগমের মাদকের ব্যবসা ছাড়া আয়ের অন্য কোনো উৎসের সন্ধান পায়নি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, রহিমা একজন গৃহিনী পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খুলেছেন । কোনো কোনো ব্যাংকে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসার কথা বলেও হিসাব খোলেন। কিন্তু তার দেওয়া এসব তথ্যের সঙ্গে বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ৫ থেকে ৭ বছর আগেও রহিমা গেন্ডারিয়ার নামাপাড়া রেল লাইন বস্তিতে বসবাস করতো। মাদকসহ রহিমা বহুবার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, রহিমা এই পুরো টাকাই লেনদেন করেছে মাদক বিক্রি হিসেবে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এই লেনদেন হয়েছে। রহিমার মতো তার স্বামী মো.হযরত আলীও কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। যিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। রহিমার নামে রাজধানীর গেন্ডারিয়া ও রামপুরা থানায় ৯টি এবং তার স্বামীর নামে একাধিক থানায় ১০টি মাদক মামলা রয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নামে বেনামে বাড়ি, গাড়ি ও জমি ক্রয় করেছেন রহিমা। এক সাথে অবৈধ মাদকের ব্যবসার সুবাদে এক সময় রহিমা বেগম তার আগের স্বামী আঃ মালেককে ছেড়ে দিয়ে কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী হযরত আলীকে বিয়ে করেন। এরপর রহিমা বেগম ও হযরত আলী বেপরোয়াভাবে মাদকের ব্যবসা শুরু করেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ও রহিমার মামলার অনুসন্ধ্যানী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী আসলাম হোসেন বলেন, আসামি ও তার স্বামী (জীবিতাবস্থায়) পরস্পর যোগসাজশে ১২ টি ব্যাংক হিসাবে টাকা ও সম্পদ অবৈধ মাদক ব্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জন করে। মূলত সে মাদক ব্যবসার আয়ের অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ গোপন বা ছদ্মাবৃত্ত করে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে অবৈধ মাদক বিক্রিত টাকা স্থানান্তর ও হস্তান্তর করে সম্পদে রূপান্তর করেছে। যা মানি লন্ডারিং আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কর্তৃপক্ষ পরে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন।
এমআইকে/ একেবি