images

আইন-আদালত

৮৫ মিনিটে ৮ সাক্ষীর জবানবন্দি!

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০৩ এপ্রিল ২০২৩, ০৬:১৫ পিএম

একটি হত্যা মামলায় ৮৫ মিনিটের মধ্যে ৮ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা একজন তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষে কিভাবে সম্ভব! এ বিষয়টি নিয়ে আশ্চর্য হয়েছেন হাইকোর্ট, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে একজন মানুষের পক্ষে এভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে কিভাবে সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলো? এমন প্রশ্ন সবার। কিন্তু বাস্তবে এই অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন মানিকগঞ্জ পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদুর রহমান। তিনি একটি হত্যা মামলায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে তিনি কিভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে মামলার সিজার লিষ্ট, সুরতহাল প্রস্তুত, ১৬১ ধারায় ১৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে নিয়ে গেলেন। আবার আসামিকে আদালতে নিয়ে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ এবং একই সময়ে থানায় কিভাবে উপস্থিত ছিলেন। এসব নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ায় মাসুদুর রহমানকে বরখাস্তের ঘটনা ঘটেছে।

ফৌজদারি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একজন মানুষের পক্ষে এভাবে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করা কোনোভাবেই সম্ভব না। যা করা হয়েছে তা অস্বাভাবিক।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও সিনিয়র আইনজীবী এবিএম আলতাফ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার বিচারক ও উকালতি জীবনে এমন এমন ঘটনা দেখি নাই। এত অল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ৮৫ মিনিটের মধ্যে ৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ কোনোভাবেই সম্ভব না। অসম্ভব ও অস্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এটা কখনোই হতে পারে না। একজন মানুষ কোনোমতেই এটা করতে পারেন না। 

ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ ও এ মামলার হাইকোর্টের আইনজীবী মোহাম্মাদ শিশির মনির ঢাকা মেইলকে বলেন, এ মামলার সব নথিপত্র নিয়ে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন। সেই আদেশের পর আদালতে আজ সকালে স্বশরীরে হাজির হন পুলিশের সেই তদন্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদ। তদন্ত সংক্রান্ত সব নথি আদালতে দাখিল করা হলে আদালত সেগুলো পরীক্ষা নিরিক্ষা করেন। পরে আদালতের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ায় আদালত তাকে এ মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত করে। মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে এ মামলাটি তদন্ত করতে পুলিশ সুপারের নিচে নয় এমন কর্মকর্তা দিয়ে এই হত্যা মামলা তদন্ত করাতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তদন্ত করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে সেটি দাখিল করতে হবে। আগামী ৫ জুন এ মামলার পরবর্তী আদেশের জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা সম্পর্কে আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, আদালতের সামনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ায় তাকে বরখাস্ত করা হলো। আদালত বলেছেন কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে। 

এই মামলার অনিয়মটা হলো- একটা মামলার তদন্ত শুরু করেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার্জশীট দিলো। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি মামলায় ১৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন। যা করেছেন তিনি ২ ঘণ্টার মধ্যে। অর্থাৎ একজন সাক্ষীর জবানবন্দি তিনি গ্রহণ করেছেন সাড়ে ৯ মিনিটের মধ্যে। যা কোনো মানুষের পক্ষে অবিশ্বাস্য। এটি কোনো সুস্থ্য মস্তিকের মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না। এ মামলায় ম্যাজিষ্ট্রেট বলেছেন পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ উপস্থিত ছিলেন ১৬৪ ধারায় বক্তব্য দেওয়ার সময়। আর পুলিশ বলছেন যে, ১১ টার সময় তিনি  ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। আদালত বলেছেন, এই সমস্ত মিথ্যা তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করায় এবং সেটি প্রমাণ হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আমরা মনে করি এই মামলায় রহস্য উদঘাটিত হবে কারণ যিনি ভিকটিম তিনি হলেন আসামির ভগ্নিপতি। আমরা মনে করি এখানে তৃতীয় পক্ষ জড়িত। পিবিআইয়ের তদন্তের মাধ্যেমে অবশ্যই রহস্য উদঘাটন হবে। প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে। এ মামলার বাদী আদালতের সামনে বলেছেন তিনি আসলে এই মামলা নিজ থেকে দায়ের করেন নাই। তার স্বাক্ষর নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত বলেছেন এটি তদন্ত করবেন আসলে এটি হয়েছে কি না। বলেছেন তিনি এইভাবে সুপারসনিক গতিতে তদন্ত করলেন এটাতে তৃতীয় পক্ষ জড়িত আছেন কি না। মূলত হত্য মামলার রহস্য উদঘাটন করতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। এ মামলার পরবর্তী শুনানী ৫ জুন। 

রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, আদালতে উনি ভুল তথ্য দিয়েছেন এজন্য তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন আবার একই সময় তিনি থানায়ও ছিলেন। এখানে দুই ধরনের তথ্য এসছে। এ মামলা পুনঃতদন্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা দিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান অবস্থায় এসআই মাসুদুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এ সময়ে তিনি বেতন পাবেন।  

এর আগে এ মামলার শুনানি চলাকালে মানিকগঞ্জের মো. রুবেল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমানকে ভর্ৎসনা করেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, আদালতের কাছে বেশি স্মার্টনেস দেখাবেন না। একদম কারাগারে পাঠিয়ে দেব। শুনানির শুরুতে হত্যা মামলা ২৪ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে হাইকোর্ট বলেন, আপনার মতো পুলিশ অফিসার দরকার। আপনি মাত্র ২৪ ঘণ্টায় হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করলেন? এ সময়ের মধ্যে কখন সাক্ষী নিলেন, কখন ঘুমালেন, কখন খাওয়া-দাওয়া করলেন তা আমাদের দেখান। আর কতটি মামলা আপনি তদন্ত করেছেন, সেগুলো কত সময়ে শেষ করেছেন তার তালিকা জমা দেন।

জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, এটা আমার প্রথম তদন্ত। এরপর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, অভিযোগপত্র দ্রুত দিলেও সমস্যা। আবার দেরি করে দিলেও সমস্যা। তখন আদালত বলেন, তাহলে আমরা একটা মক ট্রায়াল করি। কত দ্রুত অভিযোগপত্র দিতে পারেন, সেটা আমরা দেখতে চাই।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সেটা দেখার এখতিয়ার আপনাদের আছে। একপর্যায়ে দাখিল করা নথিতে আদালত দেখতে পান মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার মামলার একটি তদন্ত প্রতিবেদন রেফারেন্স হিসেবে নথিতে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানাকে ভর্ৎসনা করে আদালত বলেন, কেন আপনি এটা দিলেন। আপনার কাছে তো রেফারেন্স চাওয়া হয়নি। বেশি স্মার্টনেস দেখাচ্ছেন। নিজেকে বেশি স্মার্ট মনে করেন? কোর্টের সঙ্গে বেশি স্মার্টনেস দেখাবেন না। একদম কারাগারে পাঠিয়ে দেব। এরপরে আদালত এই মামলার শুনানি দুপুর ২টা পর্যন্ত মুলতবি করেন। দুপুর ২টার পর আদালত তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন।

এর আগে গত ২ মার্চ ‘লাশ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ২৪ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপে একটি জাতীয় দৈনিক। সেই প্রতিবেদনটি যুক্ত করে ওই মামলার নথি তলবের নির্দেশনা চেয়ে আসামি সোহেল ওরফে নুরুন্নবী ও বাদী চম্পা আক্তার ওরফে অঞ্জনা ৫ মার্চ ওই আবেদন করেন। সোহেল ও চম্পা সম্পর্কে ভাই–বোন। আর নিহত রুবেল সোহেলের ভগ্নিপতি। আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

শুনানিতে শিশির মনির আদালতে বলেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ওই হত্যার ঘটনার পর ২৪ সেপ্টেম্বর মামলা হয়। মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, সুরতহাল প্রতিবেদন, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং ১৩ জনের সাক্ষী নেওয়ার পর ২৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সবকিছু এক দিনের মধ্যেই হয়ে গেছে। তাই কার্যধারার সঠিকতা নির্ণয় করা প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত বলেন, এত তাড়াতাড়ি অভিযোগপত্র হতে দেখিনি। প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, অস্বাভাবিক গতিতে তদন্ত হয়েছে। আধা ঘণ্টা করে হলেও ১৩ জনের সাক্ষী নিতে সাড়ে ছয় ঘণ্টা লাগার কথা। আগে থেকে তৈরি করা, সবাই এসে দিয়ে গেল মনে হচ্ছে। তিনি (তদন্ত কর্মকর্তা) আসুক, শুনি। এরপর তাকে তলব করা হয়। সেই তলব আদেশে তিনি আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

এআইএম/এমএইচএম/এমআর