নিজস্ব প্রতিবেদক
০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের করা যৌন হয়রানির অভিযোগে সাবেক ম্যানেজার মঞ্জুরুল আলমের বিরুদ্ধে দুটি বিষয়ের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
তবে উচ্চ আদালতের নীতিমালা অনুযায়ী এই তদন্ত প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন বিসিবির আইনজীবী মাহিন এম রহমান।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার ও নারী দলের সাবেক ম্যানেজার মঞ্জুরুলকে আগেই ক্রিকেট বোর্ডের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে আজীবন নিষিদ্ধ (লাইফটাইম ব্যান) করা হয়েছে।
তদন্ত শেষ হওয়ার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন প্রকাশ না করার কারণ ব্যাখ্যা করে আইনজীবী মাহিন এম রহমান জানান, উচ্চ আদালতের ‘প্রিভেনশন অব সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ (পশ) নীতিমালা অনুযায়ী এটি একটি গোপনীয় নথি।
তিনি বলেন, পশ গাইডলাইনে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, যৌন হয়রানি সংক্রান্ত তদন্তের মেটেরিয়ালস বা রিপোর্ট গণমাধ্যম কিংবা পাবলিক ডোমেইনে প্রকাশ করা যাবে না। ইট ইজ টু বি ট্রিটেড অ্যাজ আ কনফিডেনশিয়াল ডকুমেন্ট। তদন্তে ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর তথ্য থাকে এবং অনেক সাক্ষীর সংশ্লিষ্টতা থাকে। ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট কারও যেন সম্মানহানি বা সামাজিক ক্ষতির কারণ না ঘটে, সেজন্যই এটি জনসমক্ষে না আনার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।‘
আদালতের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়া কখনোই এই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে প্রকাশ করা হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
এর আগে নারী জাতীয় দলে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে। তখন সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম অভিযোগ করেন, নিউজিল্যান্ডে ২০২২ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময় নারী দলের তখনকার নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু তাকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
জাহানারার অভিযোগ তদন্তে বিসিবি সাবেক বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর। পরে আরও দুজন সদস্য নেওয়া হয়।
প্রায় তিন মাস পর উভয় পক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে গত ২ ফেব্রুয়ারি একটি বিশদ প্রতিবেদন তৎকালীন বিসিবি সভাপতির কাছে জমা দেয় কমিটি। এরপর ফেব্রুয়ারিতে বোর্ড শুধু দুটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, মঞ্জুর বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ফাইন্ডিংস বা ফলাফলের বিষয়ে বিসিবির এই আইনজীবী বলেন, ‘তদন্তে মঞ্জুরুল আলমের বিরুদ্ধে আনা দুটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। একটি হলো ‘হাই-হ্যান্ডেড রুড বিহেভিয়ার’ (কর্তৃত্বপরায়ণ রূঢ় আচরণ) এবং অপরটি ‘ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট টাচিং’ (অনুপযুক্ত স্পর্শ)। এ দুটোই যৌন হয়রানির আওতাভুক্ত। তবে জাহানারা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছিলেন, তদন্ত কমিটি সেগুলোর কোনো সত্যতা পায়নি।’
এদিকে বিসিবির দেওয়া আজীবন নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে মঞ্জুরুল আলম হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করেছিলেন। তবে শুনানিতে বিসিবির আপত্তির পর হাইকোর্টের দুটি পৃথক ডিভিশন বেঞ্চই তার আবেদন খারিজ করে দেন।
আইনজীবী মাহিন জানান, রিট শুনানির সময় আদালতের কাছে তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রদর্শন করা হয়েছিল এবং আদালত বিষয়টি পর্যালোচনা করেই মঞ্জুরুলের আবেদন খারিজের আদেশ দেন। এছাড়া এক নারী ক্রীড়াবিদের করা যৌন হয়রানি সংক্রান্ত অপর একটি রিট পিটিশনে বিসিবি পক্ষভুক্ত রয়েছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
ফৌজদারি ব্যবস্থার বিষয়ে বিসিবির ভাষ্য, তদন্তে সিদ্ধান্ত জানানোর পরই জাহানারাকে বলা হয়েছিল যে এটি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ায় ভুক্তভোগী হিসেবে তাকেই সরাসরি মামলা করতে হবে। জাহানারা আইনি পদক্ষেপ নিতে চাইলে বিসিবির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ মেনে বিসিবি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘পশ গাইডলাইন’ কার্যকর করেছে বলেও জানান মাহিন এম রহমান।
তিনি জানান, নারী ক্রিকেটার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি পৃথক অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বোর্ডের ওয়েবসাইটে ২৪ ঘণ্টা অভিযোগ জানানোর একটি বিশেষ ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে যেকোনো নারী কর্মী যেকোনো সময় অভিযোগ জানাতে পারবেন।
আরএনবি/এএইচ