নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
এসআরবির (সাবেক র্যাব) সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বলেছেন, সুন্দরবনের কটকা, নিশানখালী ও মরাভোলার ক্রসফায়ারের ঘটনায় হওয়া নির্বাহী তদন্ত রিপোর্টগুলো ছিল ‘ফরমায়েশি’। ওই সব রিপোর্টে জিয়াউল আহসানের নাম না থাকলেও তদন্তে তার সুস্পষ্ট সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে জেরার জবাবে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে এ দাবি করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এদিন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে রেখে ভার্চুয়ালি শুনানিতে যুক্ত করা হয়। জিয়াউল আহসানের পক্ষে তাকে পঞ্চম দিনের মতো জেরা করেন আইনজীবী সাহিদুর রহমান।
জেরায় আইনজীবী জানতে চান, সুন্দরবনের কটকা, নিশানখালী ও মরাভোলার ঘটনায় নির্বাহী তদন্ত রিপোর্ট ‘ফরমায়েশি’ ছিল মর্মে তিনি অসত্য বলেছেন কি না। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
তিনি জানান, তার বর্ণনায় আসা এনকাউন্টারগুলোর মধ্যে গাজীপুরের চারটি ঘটনার কোনো নির্বাহী তদন্তই হয়নি। আর সুন্দরবনের তিনটি ঘটনায় নির্বাহী তদন্তের যে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল প্রভাবিত ও সাজানো।
জেরার এক পর্যায়ে র্যাবের নথিপত্র ও আলামত সংগ্রহ নিয়ে রফিকুল ইসলাম জানান, জিয়াউল আহসানের পরিচালিত অভিযানগুলোতে ব্যবহৃত গাড়ির মুভ স্যাংশন, সিসিটিভি ফুটেজ, সিসি ও জিডি সংগ্রহের জন্য তিনি র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহিদুর রহমান) বরাবর ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
তবে সদর দফতর থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া অভিযান সংশ্লিষ্ট গাড়ি বা চালকদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, কারণ গাড়িগুলো র্যাবের যানবাহন শাখা নিয়ন্ত্রণ করত।
একইভাবে এসআরবি (সাবেক র্যাব) সদর দফতরের অস্ত্রাগারে অভিযান সদস্যদের নামে অস্ত্র ইস্যু হয়েছিল কি না—তা জানার চেষ্টা করেও তথ্য পাননি বলে জানান তিনি। তবে তার তদন্তে গোয়েন্দা শাখার (ইন্ট উইং) কর্মকর্তা ছাড়া ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল অভিযানের সঙ্গে ছিলেন বলে তথ্য মিলেছে।
জেরায় তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) প্রতিবেদনে জিয়াউল আহসান সম্পর্কে কোনো বিরূপ তথ্য না পাওয়া গেলেও গুম সংক্রান্ত কমিশন থেকে তথ্য মিলেছে। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার পরামর্শে অন্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে শুধু জিয়াউলকে আসামি করা হয়েছে—আসামিপক্ষের এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
জবানবন্দিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
এর আগে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া মূল জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম র্যাবের বিরুদ্ধে ঠান্ডা মাথায় অন্তত দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ আনেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৫ মার্চ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় আত্মগোপনে থাকা সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিককে আটক করে র্যাব গোয়েন্দা শাখা। ওই বছরের ১০ থেকে ১৫ মের মধ্যে কোনো এক রাতে বরগুনার চরদুয়ানী বরফ কলের ঘাট থেকে ট্রলারে করে নজরুলসহ ৩-৪ জনকে বলেশ্বর নদীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিয়াউল আহসানের সরাসরি নেতৃত্বে ও নির্দেশে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে লাশ নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাগেরহাটের শরণখোলায় বলেশ্বর নদীর তীরে ভাসমান একটি বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়, যা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নজরুল ইসলাম মল্লিকের বলে শনাক্ত হয়।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, লাশ ফেলার কাজে ব্যবহৃত ট্রলারের মালিক আলকাছ মল্লিক ঘটনাটি পরিচিতদের জানিয়ে দিলে ক্ষিপ্ত হন জিয়াউল আহসান। পরে ২০১১ সালের ১৫ জুন আলকাছকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুম করা হয়; পরিবারের ধারণা তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়েছে। নজরুল ও আলকাছসহ অন্তত ৫০ জনকে হত্যার ঘটনায় আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।
এছাড়া সুন্দরবনের তিনটি কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে জবানবন্দিতে বলা হয়- ২০১১ সালের ১২ নভেম্বর খুলনার দাকোপে সুন্দরবনের নিশানখালীতে বনদস্যু দমনের নামে হাত-পা বাঁধা মাসুম ওরফে মাসুদ ও মান্নান নামের দুই বন্দিকে ট্রলারে এনে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এছাড়া ২০১২ সালের ১৬ মার্চ বাগেরহাটের শরণখোলায় ভোলা নদীর মরাভোলা খালে তথাকথিত ‘ত্রিমাত্রিক অভিযান’ সাজানো হয়। নাটকটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে র্যাবের হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়। আগে থেকেই আটক থাকা জিহাদ, সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ ও বেল্লাল নামের পাঁচজনকে বরগুনা থেকে ট্রলারে এনে সেখানে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে চরদুয়ানী ঘাট থেকে ট্রলারে শিশির কুমার মন্ডল ওরফে মন্টু মেম্বার, বাচ্চু, জামালসহ মোট আটজনকে হাত-চোখ বেঁধে সুন্দরবনের কটকার উদ্দেশে নেওয়া হয়। যাত্রাপথে মাঝনদীতে চারজনকে গুলি করে, পেট কেটে ও সিমেন্টের ব্লক বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ভোরে শরণখোলার কটকা ফরেস্ট পোস্টের অদূরে বাকি চারজনকে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে ও নির্দেশে বরগুনার বলেশ্বর নদ ও সুন্দরবন অঞ্চলে শতাধিক মানুষকে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে ‘গেস্টাপো পদ্ধতিতে’ হত্যা করা হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হওয়া এ মামলায় জিয়াউল আহসানই একমাত্র আসামি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলায় মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে— যার মধ্যে প্রথমটি ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা; দ্বিতীয়টি ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার বলেশ্বর নদীতে সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুলসহ ৫০ জনকে হত্যা এবং তৃতীয়টি একই সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় মাসুদসহ ৫০ জনকে কথিত এনকাউন্টারে হত্যার অভিযোগ।
আরএনবি/এএইচ