নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে বর্তমান সরকারের কোনো ‘লুকোচুরি’ নেই এবং কাউকে বাঁচানোরও কোনো উদ্দেশ্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রক্রিয়ায় সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল ডিজিটাল আলামতের সূত্রে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত একটি ‘নাটকীয় মোড়ে’ পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) হাইকোর্টে এই মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন অ্যাটনি জেনারেল।
এর আগে, বিচারপতি শিকদার মো. মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মোহাম্মদ আজিজুল হকের দাখিল করা ২৭ পৃষ্ঠার অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
শুনানি শেষে আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুদকের অভিযানে প্রায় ৩০০টি সিডিসহ বিপুল ডিজিটাল আলামত জব্দ করা হয়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরও সমর্থন করেন।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ আজিজুল হক ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং প্রাপ্ত আলামত চেয়ে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। উদ্ধার হওয়া সিডিগুলোতে অসংখ্য জিও-লোকেশন, এসএমএস, কল রেকর্ড (সিডিআর), অডিও-ভিডিও রয়েছে। আইসিটির টিম এগুলো পর্যালোচনা করছে। পর্যালোচনা শেষে সাগর-রুনি হত্যা সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গেলে তা স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাই করে তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘৩০০টি সিডি পুরোপুরি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট তথ্য বের করা একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এ কারণেই তদন্তের স্বার্থে আদালতের কাছে কিছুটা দীর্ঘ সময় চাওয়া হয়েছিল। আদালত আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন।’
শুনানিতে তদন্তের গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তদন্তের স্বার্থে তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ্য আদালতে উপস্থাপন করা সমীচীন নাও হতে পারে। ফলে আদালত বলেছেন, প্রয়োজনে ‘ইন-ক্যামেরা’ (রুদ্ধদ্বার) শুনানিতে গুটি কয়েক দায়িত্বশীল ব্যক্তির উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য শোনা হবে।
মামলার অতীত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ২০১২ সালে হত্যাকাণ্ডের পর থানা পুলিশ ও ডিবি কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে র্যাব দীর্ঘ ১২ বছর তদন্ত করলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি; আটজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হলেও জব্দকৃত আলামতের ডিএনএর সঙ্গে তাদের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি খোয়া যাওয়া ডিভাইস বা হত্যার মূল রহস্যও উদ্ঘাটিত হয়নি।
তার ভাষ্য, ঘটনার সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাথমিক পুলিশ কর্মকর্তাদের এখন অনেককেই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তদন্তের ক্ষেত্রে ‘চেইন অব পজেশন’ নষ্ট হয়েছে। তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে উচ্চ আদালতের আদেশে টাস্কফোর্স পুনর্গঠিত হয়। পিবিআই কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৯০ জন সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং ২৪ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন।
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিবর্তিত বাংলাদেশে এই সরকারের কোনো স্বার্থ নেই কাউকে আড়াল করার। এখানে কোনো কিছু ‘হাইড অ্যান্ড সিক’ করার নেই। সরকার কাউকে বাঁচানো কিংবা রক্ষা করতে আসেনি। আমাদের লক্ষ্য একটাই- একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে সত্য উদ্ঘাটন করা।’
আরএনবি/এসআই