নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
স্বামী-স্ত্রীর কলহ কিংবা বাচ্চার হেফাজত (কাস্টডি) নিয়ে ধনিক শ্রেণির মানুষের ‘ফ্যান্টাসিপূর্ণ’ মামলার পেছনে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। এসব মামলার ভিড়ে সাধারণ ও নিরপরাধ বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শেষে নিয়মিত বিচারকাজ শুরুর প্রাক্কালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
‘প্রধান বিচারপতির কোর্টেও স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মামলা’
উচ্চ আদালতে তুচ্ছ পারিবারিক ও দেওয়ানি বিরোধের ভিড় নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বা বাচ্চার কাস্টডির মতো পারিবারিক বিষয়গুলো সামাজিকভাবে পরিবারের মধ্যেই মীমাংসা হওয়ার শিক্ষা আমাদের রয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত, এমনকি প্রধান বিচারপতির এজলাসেও স্বামী-স্ত্রীর কলহের মামলা শুনতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মানুষ দূরে সরে যাওয়ার কারণেই এটি হচ্ছে।
নিজের আগের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আমি আগেও বলেছিলাম এবং আজও আমার সেই অবস্থানে অনড় রয়েছি—এসব ফ্যান্টাসিপূর্ণ মামলা মূলত একটি ধনিক শ্রেণির মানুষ করে থাকেন। এ ধরনের মামলার কারণে সাধারণ মানুষ, নিরপরাধ মানুষ ও প্রকৃত বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের সম্পত্তির দ্বন্দ্ব কিংবা বাবার মৃত্যুর পর সন্তানদের শেয়ার নিয়ে বিরোধ আদালতের মাসের পর মাস ও দিনের পর দিন সময় ব্যস্ত রাখছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এই জটিলতায় আমরা সব সময় তা পারছি না। এসব পরিহার করে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
একই সঙ্গে দেশে মামলার স্তূপ বাড়ার পেছনে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসিয়ে মামলার শাখা-প্রশাখা বাড়ানোর প্রবণতাকেও দায়ী করেন তিনি।
‘বছরের অর্ধেক সময় ছুটির যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে’
সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ ছুটির বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দেশে যখন লাখ লাখ মামলার বিশাল জট, তখন বছরের প্রায় অর্ধেক সময় আদালত ছুটিতে থাকার ঐতিহ্য পরিবর্তনের সময় এসেছে।
তিনি বলেন, আমি নিজে যখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ছিলাম, তখন ছুটি কমিয়ে আনার জন্য তৎকালীন প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিত অনুরোধ করেছিলাম। সম্প্রতি বর্তমান প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও ছুটি কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে অনুরোধ করেছি। তিনি এতে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
তবে ছুটি কমানোর বিষয়টি এককভাবে প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার নয় জানিয়ে তিনি বলেন, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সব বিচারপতির ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা বৃদ্ধি এবং কার্যদিবস বাড়িয়ে মামলার স্তূপ কমাতে ছুটির লাগাম টানা প্রয়োজন।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করেন, নিম্ন আদালতের এক মাসের ছুটি বর্তমান প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে ইতিমধ্যে দুই পর্বে ভাগ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি হিসেবে জুবায়ের রহমান চৌধুরীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই সুপ্রিম কোর্টের প্রথম দীর্ঘ ছুটি ছিল বলে জানান তিনি।
৫৭ বেঞ্চ পুনর্গঠন ও তরুণ বিচারক
ছুটি শেষে হাইকোর্ট বিভাগের ৫৭টি বেঞ্চের অধিক্ষেত্র পুনর্গঠন প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এটি প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক এখতিয়ার হলেও এই পরিবর্তন বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়াবে।
তিনি বলেন, এই পুনর্গঠনে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ, অথচ সততা, মেধা ও কর্মনিষ্ঠার প্রমাণ দেওয়া বিচারপতিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তরুণ বিচারপতিদের অন্তর্ভুক্তি মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
চা-চক্রে আইনজীবী ও আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার বরাত দিয়ে তিনি জানান, এই পুনর্গঠনে আইনজীবী সমাজ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
‘বিচারকের সংখ্যা নয়, প্রয়োজন মেধা ও সততা’
উচ্চ আদালতে বিচারক সংকটসংক্রান্ত প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল স্পষ্ট করেন, বিচারক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া তাঁর কার্যালয়ের এখতিয়ার নয়; সংবিধান অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির বিষয়।
আপিল বিভাগে বিচারকের সংকট রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই মামলাজট কমে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে গুণগত মানসম্পন্ন বিচারক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। আমাদের প্রয়োজন কর্মনিষ্ঠ, সৎ, দক্ষ এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিচারক।
আদালতের কার্যতালিকা দেখিয়ে তিনি বলেন, একই এখতিয়ারসম্পন্ন পাঁচ থেকে সাতটি বেঞ্চের মধ্যে কোনো কোনো বেঞ্চ এক দিনে শত শত মামলা নিষ্পত্তি করে ফেলছে, আবার কোনো কোনো বেঞ্চে মামলা এগোচ্ছে না। শুধু বিচারক বাড়িয়েই যদি সমাধান হতো, তবে যেসব দেশে প্রচুর বিচারক রয়েছেন, সেখানে মামলার জট থাকত না।
চার চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার শুনানি নভেম্বর-ডিসেম্বরে
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের বিশেষ তৎপরতায় আপিল বিভাগে দেশের বহুল আলোচিত চারটি হত্যা মামলার শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মামলাগুলো হলো—নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলা, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা, দর্জি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলা এবং কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা।
কাজল জানান, চলতি নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই এসব গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি গ্রহণ করা হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বেঞ্চের অগ্রগতি
ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির গঠিত বিশেষ বেঞ্চের ভূয়সী প্রশংসা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি জানান, মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবসে ওই বিশেষ বেঞ্চ মাগুরার আসিয়া ও ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলাসহ অন্তত ২৪টি চাঞ্চল্যকর মামলা নিষ্পত্তি করেছে। হাইকোর্টের ৫৭টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হলেও ওই বিশেষ বেঞ্চটির এখতিয়ার বহাল রাখা হয়েছে।
হাইকোর্টে বিচারাধীন প্রায় ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তিতে আরও বিশেষ বেঞ্চ প্রয়োজন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ন্যায়বিচার কেবল করলেই হয় না, তা যেন দৃশ্যমান হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব কেবল প্রসিকিউশন চালানো নয়; একজন নাগরিক যেন অবিচারের শিকার না হন কিংবা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি দীর্ঘ কারাভোগের পর খালাস পেতে গিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় না হারান, সেটিও দেখতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, কনডেমড সেলে থাকা আসামিদের দ্রুত বিচার বা খালাস পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোর নিষ্পত্তি করার সক্ষমতা ও গতি বাড়ানোই আসল বিষয়। প্রয়োজন মনে করলে প্রধান বিচারপতি আরও বেঞ্চের কথা বিবেচনা করতে পারেন।
আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার
সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের স্থানসংকটজনিত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এজলাসে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ের মধ্যে এত সাংবাদিকের একসঙ্গে বসার জায়গা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করে কার্ড বা প্রবেশাধিকার দেওয়ার যে বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে, তা নিয়ে তিনি নিজে এবং দুজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
গাজীপুরের ঘটনা ও আইনি বার্তা
গাজীপুরে এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র নির্যাতন এবং পরবর্তী সময়ে অভিভাবকদের মারধর ও ভাঙচুরের পাল্টাপাল্টি দুটি ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আইনের শাসন মেনে চলার ওপর জোর দেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশের যেকোনো পরিস্থিতির জন্যই সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে, আর নিরপরাধ হলে খালাস মিলবে। তবে কারও নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
শিক্ষকদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষকরা ‘লোকোপ্যারেন্টিস’ অর্থাৎ পিতা-মাতার সমতুল্য ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষাঙ্গনে শিশুরা যেন নিজেদের অনিরাপদ মনে না করে, তা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জেরে গোটা শিক্ষক সমাজকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করাও ভুল।
সন্তানের সুরক্ষায় পিতা-মাতার স্বাভাবিক আবেগ অনুধাবনযোগ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, যেহেতু উভয় পক্ষ থেকেই মামলা হয়েছে এবং সেগুলো তদন্তাধীন, তাই পুরো বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হবে।
আরএনবি/এআর