Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

মৃত্যুর মিছিল থামুক, ফিরুক অর্থনীতির গতি

২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

জগতের গতিধারা আর খবরের কাগজের কালি-উভয়ই বড় চঞ্চল। শরৎ ফুরিয়ে কার্তিক এলো বলে, কিন্তু বাংলার আকাশে খবরের মেঘ কিছুতেই কাটছে না। আজকের প্রধান খবরগুলোর দিকে তাকালে প্রথম চোখ আটকায় নাটোরের বনপাড়ার মহাসড়কে। বড়াইগ্রামে ভোর সাড়ে চারটায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪টি তাজা প্রাণ নিভে গেছে, আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। ভোরের আলো ফোটার আগেই কতগুলো পরিবারের জীবনে নেমে এলো দীর্ঘ অন্ধকার। আমাদের সড়ক যেন এক অদ্ভুত পরীক্ষাগার, যেখানে যানবাহনের গতি বাড়ে, অথচ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা বাড়ে না। উৎসবের মৌসুমে মানুষ ঘরে ফেরে, প্রিয়জনের কাছে যায়; সড়ক তাদের সেই আনন্দের পথ হবে, মৃত্যুর সংবাদবাহক নয়। নিরাপদ সড়কের প্রতিশ্রুতি আমরা বহুবার শুনেছি। এবার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, গতিনিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর তদারকিরও দেখা হোক।

সড়কের দুর্ঘটনা আর ইনানীর রিসোর্টের আগুন-দুটি আলাদা ঘটনা। অথচ তাদের শোকের ভাষা একই। কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন দশজন; আগুনের কারণ তদন্তাধীন। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল, এমনকি কয়েক মাস আগে ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছিল। পর্যটনের বিজ্ঞাপনে সমুদ্রের নীল জল, কাঠের কটেজ আর রোমান্টিক সূর্যাস্তের ছবি থাকে; অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ছবি সচরাচর থাকে না। অথচ বিপদের মুহূর্তে সূর্যাস্তের সৌন্দর্য কাউকে বাঁচায় না, বাঁচায় নিরাপদ বহির্গমনপথ, অ্যালার্ম ও প্রস্তুত কর্মী। নিমতলী থেকে ইনানী-প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, শোক প্রকাশিত হয়, তারপর জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে। এবার সেই স্বাভাবিকতার সংজ্ঞাটিই বদলানো দরকার। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা আগেই চিহ্নিত হবে, সতর্কতা অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। পর্যটকের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি ব্যবসা করার ন্যূনতম শর্ত।

এদিকে জীবিকার সন্ধানে বিদেশমুখী মানুষের জন্য মালয়েশিয়ার দরজা নতুন করে খোলার খবর কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দশ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; নিয়োগের জন্য ৩৩৮টি সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানিয়েছে সরকার। বহু পরিবারের কাছে বিদেশে যাওয়া মানে একটি চাকরি পাওয়া নয়, ঋণের বোঝা কমানো, সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানো কিংবা বহুদিনের ভাঙাচোরা ঘরটি মেরামত করা। তাই বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়। নিয়োগে স্বচ্ছতা, দক্ষতা অনুযায়ী কাজ, চুক্তির নিশ্চয়তা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে হবে।

একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের গতি নিয়ে উদ্বেগের পেছনে জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের আস্থা, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক জটিলতার মতো বিষয় রয়েছে। বিনিয়োগকারীর কাছে ভালো বক্তৃতার চেয়ে সময়মতো বিদ্যুৎ, দ্রুত অনুমোদন এবং নীতির স্থিরতা বেশি মূল্যবান। দেশের তরুণেরা কাজের সন্ধানে বিমানে উঠবেন, সেটি তাঁদের অধিকার; কিন্তু নিজের দেশেই কাজের সুযোগ তৈরি হলে সেই বিমানবন্দরের বিদায়দৃশ্য কিছুটা হলেও কমবে।

ব্যাংকিং খাতেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করেছে সরকার। নেতৃত্ব বদলানোর সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে সহজ হতে পারে; কঠিন কাজটি হলো ব্যাংকের ভেতরে ঋণ অনুমোদনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং আমানতকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার করা। ব্যাংক আসলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষ নিজের পরিশ্রমের টাকা রেখে বিশ্বাস করে যে প্রয়োজনে তা ফেরত পাবে। সেই বিশ্বাসের দাম কোনো ব্যালান্স শিটে পুরোপুরি লেখা যায় না।

বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং নিয়ে সাম্প্রতিক সম্পাদকীয় আলোচনার মূল কথাটিও এখানেই: অর্থনীতির গতি ফেরাতে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; দরকার স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ। অর্থনীতির চিকিৎসায় শুধু ব্যবস্থাপকের চেয়ার বদলালে হবে না, অসুখের কারণও খুঁজতে হবে। রোগীকে নতুন ডাক্তার দেখানো ভালো, তবে ওষুধের বদলে শুধু প্রেসক্রিপশনের কাগজ বদলালে আরোগ্য আসে না।

সামাজিক মাধ্যমে আজও বাংলাদেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগকে হাসির মোড়কে পরিবেশন করছেন। ঢাকার যানজটে আটকে থাকা মানুষ অফিসে পৌঁছানোর আগেই দিনের অর্ধেক ধৈর্য খরচ করে ফেলেন; উৎসবের বাজারে পণ্যের দাম দেখে কারও কেনাকাটার তালিকা ছোট হয়, কারও রসিকতার তালিকা বড় হয়। সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে বাজারদরের চাপ নিয়ে ঠাট্টা, ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে মিম, আর উৎসবের ছুটি না পাওয়া কর্মচারীদের দুঃখমিশ্রিত কৌতুক। বাঙালির এই গুণটি সত্যিই লক্ষণীয়-বিপদে পড়েও সে রসিকতার জন্য একটু জায়গা রাখে।

তবে হাসির আড়ালে থাকা বাস্তবতাটিও ভুললে চলবে না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরবরাহব্যবস্থা, বাজার তদারকি ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা দরকার; যানজট কমাতে চাই পরিকল্পিত গণপরিবহন, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ। সামাজিক মাধ্যম জনমতের দর্পণ, কিন্তু দর্পণে মুখ দেখা আর মুখ ধোয়া এক কাজ নয়। মানুষের অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নেওয়াই প্রশাসনের আসল কাজ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভারতের আসামে দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযানে এক হাজার একশর বেশি মুসলিম পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে; দশটির বেশি মসজিদ ভাঙার খবরও এসেছে। প্রশাসনের বক্তব্য, সংরক্ষিত বনভূমির অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে; অন্যদিকে, বাসিন্দাদের একাংশ দাবি করেছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সেখানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জমির অধিকার ও বন সংরক্ষণ-দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু উচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় মানুষের মর্যাদা, আইনি অধিকার ও পুনর্বাসনের বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাজা কার্যকরের আগে তারা এ বিষয়ে অবহিত ছিল না; রিয়াদের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকেরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব নন, তাঁরা এই দেশের পরিবারের সদস্য। বিদেশে তাঁদের আইনি সহায়তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ তাই জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সৌজন্য বজায় রেখেও নাগরিকের স্বার্থে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া সম্ভব।

তবু দিনের শেষ কথাটি হতাশার হতে হবে কেন? বনপাড়ার সড়কে প্রাণ হারানো মানুষগুলোকে ফিরিয়ে আনা যাবে না, ইনানীর আগুনে হারানো জীবনও নয়; কিন্তু তাদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। সরকার, ব্যবসায়ী, পরিবহনমালিক, চালক, প্রশাসন ও নাগরিক-প্রত্যেকেরই এখানে কাজ আছে। নিরাপদ সড়ক, অগ্নিনিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র, স্বচ্ছ অভিবাসন, আস্থাযোগ্য ব্যাংকিং এবং নতুন কর্মসংস্থান-এসব কোনো অলীক স্বপ্ন নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত কাজের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য।

মালয়েশিয়ায় দশ হাজার কর্মীকে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানোর উদ্যোগটি সফল হলে সেটি আরও বড় পরিসরে নিরাপদ অভিবাসনের দৃষ্টান্ত হতে পারে। একইভাবে, প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টের আগুন নেভার আগেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শোকের বদলে সাফল্যের খবর লেখা যাবে। কার্তিকের আকাশে মেঘ থাকুক, তাতে ক্ষতি নেই; মানুষ যদি নিজের কাজটুকু ঠিকভাবে করে, তবে মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো আসবেই। আর সেই আলোর জন্য খুব বড় কোনো অলৌকিক ঘটনা দরকার নেই-দরকার ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্ত, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকে একটু নিরাপদ, একটু স্বচ্ছল এবং একটু বেশি আশাবাদী করে তোলে।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব