নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৫ পিএম
কোনো জমির স্বত্ব ও মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি বিরোধ বিচারাধীন থাকলে, সেই জমিকে ‘অর্পিত সম্পত্তির’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বা অবমুক্ত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত রায়ে বলেছেন, বিচারাধীন দেওয়ানি মামলায় চূড়ান্তভাবে স্বত্ব নির্ধারিত হওয়ার পর রায়ে বিজয়ী পক্ষের অনুকূলেই কেবল বিতর্কিত সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা (বাদ দেওয়া) যাবে। ‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ মামলার রায়ে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
জমির স্বত্ব ও মালিকানা নিয়ে দায়ের করা পৃথক দুটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের বেঞ্চ গত ১৯ মে এই রায় দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২২ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। আদালতের মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া। বিবাদী পক্ষে ছিলেন মো. নাসির শিকদার, তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মিতুল ভৌমিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও আখতার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
মামলার পটভূমি
প্রকাশিত রায়ের বিবরণে দেখা যায়, ফরিদপুর জেলার ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমিকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূচনা। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। পরবর্তীতে হস্তান্তরের ধারাবাহিকতায় অনিল কুমার দত্ত জমিটি পান এবং তার কাছ থেকে দানসূত্রে স্বত্বাধিকারী হন পুত্র অলোক কুমার দত্ত।
অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই একটি নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমিটি শাহাবুদ্দিন আহমেদের (রিট আবেদনকারী) কাছে বিক্রি করেন এবং দখল বুঝিয়ে দেন।
অন্যদিকে মো. জাহিদুর রহমান (মামলার ৪ নম্বর বিবাদী) দাবি করেন, অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ২৩ মে তার সঙ্গে ওই জমি বিক্রয়ের জন্য একটি বায়নাপত্র সম্পাদন করেছিলেন। চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি ২০০১ সালে বায়নাপত্র চুক্তির সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন চেয়ে দেওয়ানি মামলা করেন। ওই মামলায় ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর একতরফা ডিক্রি পেয়ে ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে তিনি নিবন্ধিত দলিলের অধিকারী হন।
ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে ‘টাইটেল আপিল’ করেন রিটকারী সাহাবুদ্দিন আহমেদ। আদালত বিলম্ব মার্জনা করে টাইটেল আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন।
আপিল শুনানির জন্য গ্রহণের আদেশের বিরুদ্ধে জাহিদুর রহমান হাইকোর্টে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় সিভিল রিভিশন দায়ের করেন। হাইকোর্টে শুনানি শেষে এ বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করা হয়। আগের আদেশ বাতিল করে ফরিদপুরের জেলা জজকে আপিল গ্রহণের বিষয়ে নতুন করে শুনানি করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
নির্দেশ অনুযায়ী ২০২৩ সালের ২৫ মে ফরিদপুরের জেলা জজ আপিলটি গ্রহণ করেন। আদালতের এই আদেশে আবারও সংক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে ২০২৪ সালে জাহিদুর রহমান হাইকোর্টে আবার সিভিল রিভিশন দায়ের করেন। একই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালত রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন, যা এখনও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন।
কার কী আইনি যুক্তি
শুনানিতে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া আদালতকে বলেন, ১৯৯৬ সালে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে স্বত্ব অর্জনের পর থেকে আবেদনকারী ওই জমি নিষ্কণ্টক ভোগদখলে আছেন। ২০০১ সালের চুক্তি সম্পাদনের মামলায় শাহাবুদ্দিন আহমেদকে পক্ষভুক্ত না করায় ওই ডিক্রি ও পরবর্তী দলিল আইনি দৃষ্টিতে অকার্যকর এবং পূর্বের নিবন্ধিত দলিলটি আইনের বিধান অনুযায়ী পরবর্তী দলিলের ওপর প্রাধান্য পাবে।
অন্যদিকে, জাহিদুর রহমানের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার দাবি করেন, তার মক্কেলের বায়নাপত্র দলিলটি ১৯৯৬ সালের ২৩ মে সম্পাদিত, যা আবেদনকারীর দলিলের পূর্ববর্তী। আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে অর্জিত স্বত্ব ও দলিলের ভিত্তিতে আপিল ট্রাইব্যুনাল সঠিক রায় দিয়েছেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, অলোক কুমার দত্ত ও জাহিদুর রহমানের মধ্যে হওয়া বায়নাপত্র দলিল সম্পাদন নিয়ে টাইটেল মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের রায় ও ডিক্রি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে, অলোক কুমার দত্তের কাছ থেকে রিটকারী সাহাবুদ্দিন আহমেদের জমি কেনা সংক্রান্ত বিক্রয় দলিলের সত্যতা ও বৈধতা নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে, যা এই সংক্ষিপ্ত বিচারিক কার্যধারায় নির্ধারণ করা যায় না।
আদালত বলেন, ‘মামলার এসব ঘটনা ও পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি, এই রিট আবেদনগুলোতে সম্পত্তির অধিকার, মালিকানার স্বত্ব এবং স্বার্থ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এই রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত বিচারে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। বর্তমান রিট আবেদনে জড়িত বিরোধীয় সম্পত্তির স্বত্ব আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালত কর্তৃক নির্ধারিত হতে হবে।’
বিরোধীয় সম্পত্তির স্বত্বের প্রশ্ন উপযুক্ত দেওয়ানি আদালত কর্তৃক নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তিটি এই মামলার বাদী সাহাবুদ্দিন আহমেদ কিংবা অন্যতম বিবাদী জাহিদুর রহমান—কারও অনুকূলেই অবমুক্ত করা উচিত নয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এই পর্যবেক্ষণ দিয়ে রিট আবেদন দুটি নিষ্পত্তি করে কিছু নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে (ডেপুটি কমিশনার) নির্দেশ দিয়ে আদালত বলেছেন, যেহেতু এ সংক্রান্ত বিষয়ে সিভিল রিভিশন এখনও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন, তাই রিটকারী সাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং বিবাদী জাহিদুর রহমানের মধ্যে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আইনি লড়াইয়ে যে পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তির মালিকানার স্বত্ব নির্ধারিত হবে; বিরোধীয় সম্পত্তি সেই পক্ষের অনুকূলেই অবমুক্ত করতে হবে।
ততদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বিরোধীয় সম্পত্তির দখলের বিষয়ে স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাসকো) বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই রায়ের একটি অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আরএনবি/এমআর