Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

হত্যা মামলায় আসল আসামিকে রক্ষায় ফাঁসানো হয় আমীরকে, ৭ বছর পর খালাস

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি

০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসল আসামিকে আড়াল করে নিরীহ একজনকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় মো. আমীর হোসেনকে গ্রেফতার করে আসামি করা হয়। পরে আদালতের রায়ে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ১৮ বছর কারাবাসের মধ্যে সাত বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছে কনডেম সেলে। অবশেষে হাইকোর্টের রায়ে বেকসুর খালাস পেয়েছেন তিনি।

গত ১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি বিশ্বদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে এবং আমীর হোসেনের আপিল মঞ্জুর করে এ রায় দেন।

সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি বিশ্বদেব চক্রবর্তী।

রায়ে আদালত বলেছেন, আমীর হোসেন কোনো দয়া বা অনুকম্পায় নয়, আইনের বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ নির্দোষ হিসেবে খালাস পাওয়ার অধিকার রাখেন। অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতার না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে কারাগার থেকে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ইমাম হোসেন (তারেক)। আমীর হোসেনের পক্ষে আইনি লড়াই করেন অ্যাডভোকেট মো. আতিকুল হক।

আসল আসামিকে আড়াল ও পুলিশের গাফিলতি

২০০৮ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে তিন বছর বয়সী শিশু জুলি আক্তারকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা হয়। মামলার এজাহারে মো. জামাল নামের এক দিনমজুরকে আসামি করা হয়েছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. নুরুন্নবী আসল জামালকে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হন। তদন্তে তিনি দাবি করেন, জামাল দুবাই চলে গেছেন। তবে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয়নি। পরে খাগড়াছড়ির ভূইমারা এলাকা থেকে আমীর হোসেনকে গ্রেফতার করে তাঁকেই জামাল পরিচয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়।

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আসল অভিযুক্ত জামালকে বাঁচাতে কোনো ধরনের ইমিগ্রেশন যাচাই ছাড়াই ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্দোষ আমীর হোসেনকে আসামি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আমীর হোসেন ও জামাল একই ব্যক্তি—এটি প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

নির্যাতনে আদায় করা জবানবন্দির অভিযোগ

গ্রেফতারের পর আমীর হোসেনের কাছ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়। তবে আদালতে সাফাই সাক্ষ্যে আমীর হোসেন বলেন, পায়ে ড্রিল মেশিন চালিয়ে, নখ উপড়ে এবং যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্ট ওই জবানবন্দির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আদালত বলেন, স্বীকারোক্তিতে বলা হয়েছিল, ভিকটিমকে গলা টিপে হত্যা করে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাথায় আঘাত ও পানিতে ডুবে শ্বাসরোধের কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই প্রমাণের সঙ্গে স্বীকারোক্তির বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।

আদালত আরও বলেন, এ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটের জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

শিশু সাক্ষীকে শিখিয়ে আনার অভিযোগ

মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিল ভিকটিমের তিন বছর বয়সী এক খেলার সাথি। বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তার বয়স ছিল আট বছর।

জেরায় ওই শিশু বলে, পাঁচ বছর আগে তার বয়স তিন বছর ছিল এবং সে কিছুই মনে রাখতে পারে না। আদালতে আসার তিন-চার দিন আগে মামা এসে তাকে আসামি চিনিয়ে দিয়েছেন বলেও সে জানায়।

হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, বয়সের কারণে এবং সাক্ষীকে শিখিয়ে-পড়িয়ে কাঠগড়ায় আনার কারণে সাক্ষ্য আইনের ১১৮ ধারা অনুযায়ী ওই শিশুর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।

যেভাবে মামলাটি হয়েছিল

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১৫ মে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চনপুরে আইয়ুব আলীর বাড়িতে ধান কাটার কাজ নেন জামাল নামের এক শ্রমিক। পরদিন বিকেলে আইয়ুব আলীর তিন বছর বয়সী ভাগনি জুলি আক্তার নিখোঁজ হয়। ১৮ মে হাটহাজারীর মেখলা খালের পাশ থেকে শিশুটির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় শিশুটির মামা আব্দুর রহিম বাদী হয়ে হাটহাজারী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ খাগড়াছড়ি থেকে আমীর হোসেনকে জামাল পরিচয়ে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।

বিচার শেষে ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক আমীর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আমীর হোসেন ২০১৯ সালে জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে আমীর হোসেনকে খালাস দেন।

আরএনবি/এআর