নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মব করে চেয়ার থেকে ফেলে দেওয়া বেড়া খোলা বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা হাছিনা ইসলামকে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে আদালত অবমাননার দায়ে বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলামকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার কথা জানিয়ে পরে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার পর তাকে স্কুলের সীমানায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রিটকারী শিক্ষিকার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খাজা তানভীর আহমেদ।
শুনানির বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করায় বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলামকে তলব করা হয়েছিল। তিনি আদালত প্রাঙ্গণেই ছিলেন। এজলাসে উপস্থিত হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেন। আদালত তাকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার কথা জানালে তিনি করজোড়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। পরে আদালত তাকে আর স্কুলের আশপাশে না যাওয়ার নির্দেশ দেন।
চলতি বছরের ২৯ মার্চ সকালে স্কুলে ঢুকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা হাছিনা ইসলামকে মারধর ও লাথি মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র লুটপাটের অভিযোগ ওঠে আমিনুল ইসলাম ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা হাছিনা ইসলাম বলেন, রমজানের ছুটির পর ওই দিন প্রথম স্কুল খোলে। সকাল সাড়ে আটটায় স্কুলে গিয়ে নিজের কক্ষে বসেছিলেন তিনি। সকাল ১০টার দিকে আমিনুল ইসলাম ২৫ থেকে ৩০ জন লোক নিয়ে স্কুলে ঢুকে তাকে চেয়ার ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি কোনো অনিয়ম করেননি জানিয়ে দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও ইউএনওর কাছে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
হাছিনা ইসলাম বলেন, তারা কোনো কথা না শুনে তাকে লাথি মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দিতে বলে। এরপর কয়েকজন মিলে তাকে লাথি মারেন এবং টেবিল ছুড়ে ফেলেন। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ওই ঘটনায় থানায় মামলা হলে আমিনুল গ্রেফতার হয়ে ছয় দিন কারাগারে ছিলেন বলেও জানান হাছিনা ইসলাম।
দ্বন্দ্বের সূত্রপাত নিয়ে হাছিনা ইসলাম বলেন, আমিনুল ইসলাম ২০১০ সালে স্কুলে যোগ দেন। কিন্তু তিনি জালিয়াতি করে ২০০৪ সালের নিয়োগ দেখান। তখন হাছিনা ইসলাম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অথচ তার স্বাক্ষর ছাড়াই আমিনুলের নিয়োগ দেখানো হয়। এ নিয়ে তিনটি তদন্তে তার নিয়োগে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
হাছিনা ইসলাম আরও জানান, অবৈধভাবে নানা কর্মকাণ্ডের একপর্যায়ে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার ছেলেকে মারধরের মামলায় আমিনুল সাময়িক বরখাস্ত হন। এরপর ২০২৪ সাল থেকে তাকে আবার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আইনজীবী খাজা তানভীর আহমেদ জানান, বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে আমিনুল ইসলাম হাইকোর্টে রিট করলে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আদালত একটি রুল জারি করেন। সেই রুলের অপব্যাখ্যা করে তিনি নিজেকে পুনর্বহাল দাবি করে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেন এবং স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় মার্চে ওই মব তৈরি করা হয় বলে জানান তিনি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মে মাসে হাইকোর্ট আমিনুল ইসলামকে চাকরিতে পুনর্বহাল না করতে নিষেধাজ্ঞা দেন। কিন্তু সেই আদেশ অমান্য করে তিনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জোরপূর্বক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন বলে আইনজীবীর অভিযোগ।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে স্থানীয় প্রশাসনও তার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে বলে জানান আইনজীবী তানভীর। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ অমান্যের কারণে রুল জারির পর ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার তৎকালীন ইউএনও মাহমুদা বেগম তাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে জানান, আমিনুলের অত্যাচারে টিকতে না পেরে তিনি নিজেই বদলি হয়ে চলে যাচ্ছেন। কারণ, তিনি কারও কথা না শুনে স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দ্বন্দ্ব ও পাল্টাপাল্টি আইনি পদক্ষেপের পর মঙ্গলবারের আদেশের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা হাছিনা ইসলাম দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার আইনি সুযোগ পেলেন।
আরএনবি/এআর