নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩২ পিএম
শিশুর হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে হাইকোর্টে ‘হেবিয়াস করপাস’ রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন আদালত।
‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এক শিশুর হেফাজত চেয়ে গর্ভধারিণী মায়ের করা হেবিয়াস করপাস রিটে জারি করা রুল খারিজ করে এই রায় দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এই রায় দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২১ পৃষ্ঠার এই রায়ের মূল অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনজীবী প্রিন্স আল মাসুদ।
বিবাদীদের (মামলা চলাকালীন শিশুটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক যে দম্পতির হেফাজতে ছিল) পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ফিরোজ ও আইনজীবী কাজী মারুফুল আলম।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. গোলাম রহমান ও নূর মোহাম্মদ আজমী। ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. লুৎফর রহমান।
মামলার প্রেক্ষাপট ও রিটকারীর দাবি
প্রকাশিত রায়ের বিবরণী থেকে জানা যায়, ভোলার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার দম্পতি সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের নারী-শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ানের মাধ্যমে তাদের আরেকটি ছেলেসন্তান (বাসমিন আবরাব) জন্ম নেয়।
ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার পর অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শিশুটি অসুস্থ হলে ১৭ জুলাই সাভারের সুপার মেডিকেল হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। ওই দিনই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করা হয়।
রিটকারীর দাবি, আর্থিক অনটন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লকডাউনের কারণে জসিম উদ্দিন সঙ্গে শিশুটিকে সেখানে নিতে পারেননি। পরে ১৯ জুলাই ওই হাসপাতালে ভর্তি করান। সে সময় শিশুটি এনআইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টে ছিল এবং দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সহিংসতা ও কারফিউ চলছিল। জসিম উদ্দিন ওই হাসপাতালে ভর্তি ফি, অগ্রিম ও বকেয়া মিলিয়ে মোট ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা জমা দেন।
পিতা-মাতার দাবি, চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার তাগিদে এবং অর্থের সংস্থান করতে তারা সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ১০ আগস্ট হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে আনুমানিক ৮-৯ লাখ টাকার বিল দাবি করে। তখন অর্থ জোগাড় করতে এই দম্পতি ভোলায় গ্রামে ফিরে গিয়ে পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করেন।
কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভোলা থানা থেকে ফোন পেয়ে পরদিন তারা জানতে পারেন, শিশুটির বিষয়ে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা খোঁজ নিয়ে জানেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদফতরের অধীন আজিমপুরের ‘ছোটমণি নিবাস’-এ হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে শিশুটিকে দত্তক নিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক নিসন্তান দম্পতি ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন এবং মাত্র ১০ দিনের মধ্যে একতরফাভাবে শিশুটির অভিভাবকত্ব, জিম্মা ও পাসপোর্ট সংগ্রহের ডিক্রি পেয়ে যান।
এসব প্রক্রিয়ার সময় জসিম-রোজিনা দম্পতি চেষ্টা করেও শিশুর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। পরে শিশুটিকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে গর্ভধারিণী মা রোজিনা আক্তার হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট করেন। আদালত তখন শিশুটিকে মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার মর্মে রুল জারি করেছিলেন।
বিবাদী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মামলার বিবাদীরা আদালতে এই রুলের বিরোধিতা করেন। দ্বৈত নাগরিক দম্পতির দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার সন্ধান না পেয়ে শিশুটিকে পরিত্যক্ত ও দুস্থ হিসেবে ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করেছিল। তারা আইনি প্রক্রিয়ায় পারিবারিক আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে শিশুটির বৈধ অভিভাবকত্ব পেয়েছেন।
তারা আরও দাবি করেন, শিশুটি কয়েকদিন হাতিরঝিল থানায় ছিল জানা সত্ত্বেও রিটকারী তাকে দেখার চেষ্টা করেননি বা কোনো জিডি করেননি। ১৯ জুলাইয়ের পর থেকে খোঁজ না নেওয়া সন্তানকে ‘পরিত্যাগ’ করার শামিল, যা ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী জিম্মা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা।
অন্যদিকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইনজীবী জানান, ১৯ জুলাই রাতে ভর্তির পর শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। ওইদিন রাত সাড়ে ৮টায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাবাকে খুঁজলে তিনি ফোনে জানান যে, স্ত্রী অসুস্থ থাকায় তিনি বাইরে আছেন এবং শিগগিরই ফিরবেন। কিন্তু বারবার কল করা সত্ত্বেও তিনি আর ফেরেননি।
কোনো উপায় না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২২ জুলাই তেজগাঁও থানায় জিডি করে। বিল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা চালিয়ে যায় হাসপাতাল। শিশুটি সুস্থ হলে ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠির মাধ্যমে ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়। হাসপাতালের দাবি, তারা বকেয়া পরিশোধে চাপ না দিয়ে শিশুটিকে পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পিতা-মাতা তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানান (যা ১৮ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে উল্লেখ আছে)।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
উভয় পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, পিতা-মাতা সন্তানকে স্বেচ্ছায় ‘পরিত্যাগ’ করেছিলেন নাকি রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থিক অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে সাময়িক স্থান ত্যাগ করেছিলেন— এটি একটি জটিল প্রশ্ন। দেওয়ানি ও সাংবিধানিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত শুনানির ভিত্তিতে এমন বিতর্কিত তথ্যের সত্যাসত্য নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
আদালত আরও বলেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী পারিবারিক আদালতের নির্দেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে স্পষ্ট আপিলের বিধান রয়েছে। যেখানে বিশেষায়িত আইন ও আপিল ফোরাম বিদ্যমান, সেখানে সরাসরি হাইকোর্টে রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা অনুচিত।
সার্বিক আইনি পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট রিট আবেদনটির রুল খারিজ করে দেন এবং পূর্বে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল করেন।
তবে গর্ভধারিণী মায়ের আইনি অধিকার সুরক্ষায় আদালত রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রিটকারী (গর্ভধারিণী মা) তার সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য উপযুক্ত বিচারিক ফোরামে (আইনসম্মত এখতিয়ারসম্পন্ন দেওয়ানি বা পারিবারিক আদালতে) আইনি প্রতিকার চাইতে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত থাকবেন। একইসঙ্গে রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আরএনবি/এমআর