নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আওয়ামী লীগ আমলে গুম ও খুনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়ার যে দাবি আসামিপক্ষ করেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে নাকচ করে দিয়েছেন এক সাক্ষী।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সাইদুর রহমানের জেরার মুখে এ দাবি ওড়ান মামলার ১৩ নম্বর সাক্ষী ও র্যাব-৮ এর সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান।
এদিন গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছিলেন ৫৪ বছর বয়সি সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাব্বির রহমান। বর্তমানে তিনি খুলনার ‘বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’তে ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত আছেন বলে আদালতকে জানান।
জেরায় তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, তিনি কখনোই অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার জন্য তদবির করে র্যাব-৮ এ বদলি হয়ে আসেননি এবং কখনোই
র্যাব-২ ধানমন্ডিতে চাকরি করেননি। জিয়াউল আহসান সম্পর্কে ‘অসত্য সাক্ষ্য’ দেওয়ার দাবিও তিনি নাকচ করে দেন।
এদিন সাক্ষীর দীর্ঘ জেরা সমাপ্ত হয়। জেরায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া নিজের জবানবন্দির সত্যতা নিশ্চিত করেন এই সাক্ষী। পাশাপাশি উঠে আসে 'গলফ অপারেশন' এর নামে কীভাবে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মানুষকে নদীতে ডুবিয়ে গুম করা হতো, কীভাবে সাজানো 'এনকাউন্টারের' নাটক তৈরি হতো এবং মাঝিকে গুম করার রোমহর্ষক বিবরণ। আসামিপক্ষ এসব বিবরণকে 'অসত্য' দাবি করলেও সাক্ষী তার বক্তব্যে অনড় থাকেন।
পেট কেটে বস্তা বেঁধে গুম ও ‘গলফ প্যাটার্ন’
জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী সাইদুর রহমান দাবি করেন, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মূল অভিযান শুরুর আগে গুম-খুনের যে বর্ণনা সাক্ষী দিয়েছেন, তা অসত্য। তবে সাক্ষী তা নাকচ করে দেন।
সাক্ষী নিশ্চিত করেন, মূল অভিযান পরিচালনার আগের দিন রাতে জিয়াউল আহসান ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যদের নিয়ে পাথরঘাটার দিকে যাওয়ার সময় তাকেও (সাক্ষী) সঙ্গে নেন। চরদুয়ানীতে পৌঁছানোর পর আগে থেকে প্রস্তুত থাকা ট্রলারে যম টুপি পরানো ও হাত বাঁধা অবস্থায় পাঁচজন ব্যক্তিকে ট্রলারের খোলের ভেতর ঢোকানো হয়। ট্রলার মোহনার কাছাকাছি যাওয়ার পর জিয়াউলের নির্দেশে চারজনকে খোলের ভেতর থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তাদের পেট কেটে, সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ও মাথায় গুলি করে পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়। এরপর তারা মূল অভিযানস্থল কটকার দিকে রওনা হন।
সাক্ষী সাবেক এই র্যাব কর্মকর্তা জানান, জিয়াউল আহসানের এনকাউন্টারের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ছিল, যাকে তিনি 'গলফ অপারেশন' বলতেন। এই ধরনের অপারেশনে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় শুধু জিয়াই জানতেন। তাদের খালি পায়ে এমনভাবে পরিবহন করা হতো যেন আকার-আকৃতি বোঝা না যায়। অভিযানে ব্যবহৃত যম টুপি, রশি, সিমেন্টের বস্তা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের মাধ্যমেই প্রস্তুত করা হতো। তার জানামতে, বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে জিয়াউল এমন ১৫ থেকে ২০টি ‘গলফ অপারেশন’ পরিচালনা করেছিলেন।
সাজানো এনকাউন্টার
সাক্ষী জানান, তার কাছে তিনটি এনকাউন্টার অভিযানকে (নিশানখালী, কটকা ও মরা ভোলা) সাজানো বলে মনে হয়েছে। কারণ, প্রতিটি অভিযানের আগেই নিয়ম ভেঙে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একটি দল স্পটিংয়ের নামে ঘটনাস্থলে চলে যেত। বনের ভেতর থেকে দস্যুদের একনলা বা দোনলা বন্দুকের ফায়ারের বদলে হুইসেলের শব্দ ও দস্যুদের কাছে না থাকা অটোমেটিক অস্ত্রের ফায়ারের শব্দ পাওয়া যেত।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ ও আলোকচিত্র দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, গোলাগুলির সময় র্যাব সদরদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো ধরনের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা হেলমেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে ঘটনাস্থলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, যা সাজানো অভিযান ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এসব বিষয় মানসিকভাবে মেনে নিতে না পেরে সাক্ষী তার অধিনায়কের কাছে অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতেন। কিন্তু অধিনায়ক তাকে বলতেন, "জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?" মানসিক যন্ত্রণার প্রতিকার না পেয়ে চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হলে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেন। প্রক্রিয়া শেষে ২০১৩ সালের অগাস্টে মাতৃবাহিনীতে (সেনাবাহিনী) ফেরত আসেন এবং ২০১৪ সালের মার্চে এলপিআর-এ যান। আসামিপক্ষ এই দাবিটিকে অসত্য বললে তিনি তা নাকচ করেন।
মাঝি আলকাছকে গুমের নির্দেশ
জেরায় উঠে আসে 'গলফ অপারেশনে' ব্যবহৃত ট্রলারের অন্যতম মাঝি আলকাছকে গুম করার ঘটনা। তিনি জানান, ২০১১ সালের জুনের দিকে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে আলকাছ মাঝিকে 'এলিমিনেট' করার নির্দেশ দেন, কারণ আলকাছ চরদুয়ানী বাজারে গলফ অপারেশনের তথ্য বলে বেড়াচ্ছিল। সাক্ষী অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান।
এর সপ্তাহখানেক পর আলকাছের স্ত্রী র্যাব-৮ এর অধিনায়কের কাছে এসে জানান, জিয়া স্যারের কথা বলে আলকাছকে ডেকে নেওয়া হয়েছে এবং তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি শোনার পর আলকাছের পরিণতি বুঝতে তাদের অসুবিধা হয়নি। অধিনায়ক তখন আলকাছের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে র্যাব সদরদপ্তরে বিষয়টি জানানোর পরামর্শ দেন।
জবানবন্দি ও জেরায় তিন অভিযান
রোববার জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় র্যাব-৮ ও র্যাব-৬ এর যৌথ অভিযান নিয়ে প্রশ্ন করেন।
এসময় সাক্ষী র্যাব-৮ এর সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান জানান, বাগেরহাট র্যাব-৮ এর অধীনে নয়, তবে র্যাব-৬ কে সহায়তার কোনো লিখিত নির্দেশ ছিল না। ঐ অভিযানে র্যাব-৬ থেকে কতজন এসেছিলেন বা কে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা তার স্মরণ নেই। র্যাব-৮ থেকে কর্নেল মনিরুলের নেতৃত্বে তিনিসহ কয়েকজন ছিলেন। কটকা এলাকাটি কোন থানার অধীনে বা দিনটি কী বার ছিল তা তার স্মরণ নেই। ওই অভিযানে তিনটি ভাড়া করা ট্রলার ব্যবহৃত হয়, যার একটিতে তিনি জিয়াউল আহসানের সাথে ছিলেন। ট্রলার বা মাঝির নাম তার মনে নেই।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান জানিয়েছিলেন, মূল অভিযানের আগের রাতে জিয়াউল আহসান ট্রলারে করে পাঁচজন হাত বাঁধা ব্যক্তিকে নিয়ে মোহনায় যান। চারজনকে মাঝদরিয়ায় একইভাবে হত্যা করা হয়। পঞ্চম ব্যক্তিকে মূল এনকাউন্টার স্থলে নিয়ে বনের ভেতর ঢুকিয়ে গুলি করে মারা হয়। পরের দিন চারটি লাশ উদ্ধার দেখানো হয়, যার একটি ছিল অজ্ঞাত। সাব্বিরের ধারণা, অজ্ঞাত লাশটি ওই পঞ্চম ব্যক্তির।
তবে রোববার জেরার জবাবে এই সাক্ষী বলেন, চরদুয়ানী থেকে মোহনা পর্যন্ত ট্রলার চলেছিল আনুমানিক তিন ঘণ্টা এবং তারা কটকা ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন বনাঞ্চলে থামেন। জায়গাটি নদী না খাল ছিল, তা মনে নেই। অভিযানে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার দেখানো হয়। নিহত চারজনের নাম মোড়লগঞ্জের বাচ্চু, রামপালের জামাল বা মন্টু কি না, অথবা তারা গামা বাহিনীর সদস্য কি না, তা তার স্মরণ নেই। নিহতদের স্থানীয় জেলে, বাওয়ালী ও মাওয়ালীদের দিয়ে শনাক্ত করা হলেও সাক্ষী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে কে কী মন্তব্য করেছে তা তিনি জানেন না।
অস্ত্র ও লাশ থানায় হস্তান্তরের সময় কতজন পুলিশ এসেছিল বা অফিসারের নাম কী ছিল তা তার মনে নেই। পটুয়াখালী ক্যাম্পের লে. কমান্ডার নুরুজ্জামান সেখানে ছিলেন কি না বা তিনি 'প্রথম আলো'তে কোনো সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কি না, তাও তার স্মরণ নেই।
২০১২ সালের মার্চে বলেশ্বর নদের শাখা মরা ভোলায় অভিযানের বিষয়ে সাক্ষী জানান, ঐ অভিযানে পদাতিক বাহিনী, জলযান ও র্যাবের হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। আসামিপক্ষের দাবি নাকচ করে তিনি বলেন, হেলিকপ্টারটি বিমানবাহিনীর নয়, র্যাবেরই ছিল। অভিযানে এডিজি অপস্ কর্নেল মুজিব সর্বোচ্চ পদধারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আগের রাতে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের যে টিমটি গিয়েছিল তার দলনেতা বা সদস্যদের তিনি চেনেন না। পুলিশ ও কোস্টগার্ডের উপস্থিতি স্মরণ না থাকলেও, ঘটনা শেষে পুলিশ লাশ নিতে এসেছিল।
এর আগে জবানবন্দিতে তিনি বলেছিলেন, হেলিকপ্টার ও বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক নিয়ে এই ত্রিমাত্রিক অভিযান চালানো হয়। সেখানেও আগে থেকেই ইন্টেলিজেন্স টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিল। ৩০ মিনিট ফাঁকা ফায়ারিংয়ের পর পাঁচটি মৃতদেহ ও অস্ত্র উদ্ধার দেখানো হয়।
২০১১ সালের ১২ নভেম্বরে নিশানখালী অভিযান প্রসঙ্গে জেরায় সাক্ষী জানান, নিহত দুজন রাজু বাহিনীর সদস্য মাসুদ ও মান্নান কি না, তা তার স্মরণ নেই। তবে ঐ অভিযানে পুলিশ, বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড ছিল। এছাড়া ঐসব অভিযানে নিহত পাঁচজনের নাম সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ, জিহাদ ও বেলাল কি না, তা তার স্মরণ নেই, তবে তারা বনদস্যু ছিল।
১৭ মার্চ ২০১২ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায়
জিহাদ, গামা ও সোহাগ বাহিনীর বিষয়ে কোনো সাক্ষাৎকার তিনি বা তার সিও এবং এডিজি অপস দিয়েছিলেন কি না, তা তার মনে নেই। এছাড়া আরটিভি, ইটিভি, এনটিভি, দিগন্ত টিভি এবং বৈশাখী টিভিতে এসব অভিযান নিয়ে কোনো সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল কি না, তাও তিনি স্মরণ করতে পারেননি।
কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বরের জবানবন্দিতে এই নিশানখালী অভিযান নিয়ে তিনি বলেছিলেন, বনদস্যু রাজু বাহিনীর আস্তানায় অভিযানের নামে নাটক সাজানো হয়। সেখানে আগে থেকেই ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা অবস্থান করছিল। ঘটনাস্থলে দুটি মৃতদেহ পাওয়া গেলেও মামলায় ছয়টি লাশ দেখানো হয়। বাকি চারজনকে ঢাকা থেকে এনে জিয়ার নির্দেশে হত্যা করে মূল অভিযানের সঙ্গে চালিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় র্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহাইল এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
লিমন প্রসঙ্গ ও অন্যান্য
র্যাব-৮ এ তার প্রধান কাজ ছিল প্রশাসনিক ও অধিনায়কের নির্দেশ পালন করা। এর বাইরে তার কিছু করার সুযোগ ছিল না। তার কর্মকালীন সময়ে কতগুলো এনকাউন্টার হয়েছে তা তার মনে নেই।
তিনি শুনেছেন ঝালকাঠিতে লিমন নামে এক ছেলেকে র্যাব-৮ এর সদস্যরা গুলি করে পঙ্গু করেছিল, তবে এ বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে কোনো রুল ইস্যু হয়েছিল কি না, তা তিনি জানেন না। অস্ত্র ও গুলির ব্যালিস্টিক বিষয়ে তার কোনো প্রশিক্ষণ নেই।
সাক্ষী আরও জানান, জিয়াউল আহসানের কল তিনি রেকর্ড করেননি। র্যাব-৮ এর অধীনে 'আলোর কোল' নামক জায়গায় একটি ক্যাম্প নির্মিত হতে দেখেছেন, তবে মেহের আলী, দুবলার চর বা হিরণ পয়েন্টে কোনো ক্যাম্প দেখেননি। তার সময়ে র্যাব-৮ এর গাড়িতে জিপিএস ব্যবহৃত হতো না, সদরদপ্তরের গাড়িতে হতো কি না তা তার জানা নেই। চরদুয়ানী খালের উপর ২০১২ সাল পর্যন্ত একটিমাত্র কাঠের ব্রিজ ছিল এবং সেখানে গাড়ি চলত না বলে আসামিপক্ষ যে দাবি করে, তাও সাক্ষী নাকচ করে দেন।
আরএনবি/এমআই