নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম
জুলাই আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী।
জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ৫ আগস্ট চাষাঢ়া শহীদ মিনার এলাকায় এক আন্দোলনকারীকে পিটিয়ে হত্যার সময় শামীম ওসমানকে ‘মার মার’ নির্দেশ দিতে শুনেছেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি এবং বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহমুদ হোসেন।
জবানবন্দিতে মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, জালকুড়ি লিংক রোড এবং নারায়ণগঞ্জ সদরে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকি। এই আন্দোলনে আমরা বাধার সম্মুখীন হই এবং আমাদের অনেকেই হতাহত হন। আমাদের দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু হাসান টিপু গুলিবিদ্ধ হন। আমি নিজে টিয়ারশেলের আঘাতে আহত হই। এতে আমার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪ আগস্ট চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবের সামনে এ ঘটনা ঘটে।’
১৯ জুলাইয়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘শামীম ওসমানের নেতৃত্বে চাষাঢ়া ও জালকুড়ি এলাকায় অনেক গোলাগুলি হয় এবং অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাদের মধ্যে আদিল ও ইয়াছিনও ছিলেন। ওই দিন সন্ধ্যায় ডিআইটি রোডে রিয়া গোপ নামে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম এবং ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করি। পরে ভিডিওটি তদন্ত কর্মকর্তাকে দেখিয়েছি।’
গুলির ঘটনায় জড়িত হিসেবে জবানবন্দিতে তিনি শামীম ওসমান, শাহ নিজাম, অয়ন ওসমান, তানভীর মোহাম্মদ টিটু, ভিকি, আজমেরী ওসমান, সাংবাদিক রাজু আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ, সোহানুর রহমান শুভ, শ্রমিক লীগ নেতা কাওছার আহমেদ পলাশ, সবুজ শিকদার ও সবুজের নাম উল্লেখ করেন।
৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে এই সাক্ষী বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করি। মিছিল নিয়ে কালীবাজার হয়ে কুমুদিনীর দিকে যাওয়ার সময় বিটিভির সাংবাদিক হেলাল আমাদের বলেন— তোমরা ওই দিকে যেও না। ওই দিকে শামীম ওসমান দলবলসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছেন।;
তিনি বলেন, ‘তখন আমরা কুমুদিনীর সামনে অবস্থান করি। শামীম ওসমানের দলবল তার বাড়ির দিকে ঢোকে। এরপর আমরা মিশনপাড়ার মোড়ে জমায়েত হয়ে প্রতিবাদ মিছিল করে চাষাঢ়ার দিকে যাই। আমরা সামনে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে শামীম ওসমানের লোকজন আমাদের কর্মী বদিউজ্জামানকে ধরে নিয়ে যায়।’
মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘বদিউজ্জামানকে শহীদ মিনার মোড়ে নিয়ে লোহার রড, পাইপ ও গজারি গাছের ডাল দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। আমরা তাকে উদ্ধার করতে যাই। শহীদ মিনারে গিয়ে দেখি শামীম ওসমান বলছেন—‘মার মার’। তার কথায় বদিউজ্জামানকে পেটাচ্ছিলেন সবুজ শিকদার, রিয়াদ, শুভ, শফিক, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, রুস্তম, তানভীর মোহাম্মদ টিটু ও চুন্নু মাস্টারসহ আরও অনেকে।’
ওই সময় কবির নামের এক ব্যক্তি তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন এবং আসামিরা তাকেও এলোপাতাড়ি মারধর করেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন মাহমুদ। তিনি বলেন, মারধরে তার মাথা ফেটে যায় এবং সেলাই দিতে হয়।
সাক্ষীর ভাষ্য, একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বেড়ে গেলে শামীম ওসমানের লোকজন পিছু হটে বাড়ির দিকে চলে যায়। পরে বিভিন্ন বাধা উপেক্ষা করে গুরুতর আহত বদিউজ্জামানকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান দমনে নারায়ণগঞ্জে অস্ত্র হাতে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন সাবেক এমপি শামীম ওসমান। ছাত্র-জনতাকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নিজেও গুলি করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে নিজের ‘সশস্ত্র বাহিনী’ হিসেবে মামলার অপর ১১ আসামিকে সঙ্গে নিয়ে এসব হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন তিনি।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল ও ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে ২১ জুলাই ফতুল্লার ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে এবং তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যার কথা বলা হয়েছে।
মামলায় শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। আসামিদের সবাই বর্তমানে পলাতক।
আরএনবি/এএইচ