Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

ট্রাইব্যুনালে নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন রাশেদ খাঁন

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গুম ও হত্যার ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইশতিয়াক আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

অন্যদিকে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এডিসি ইশতিয়াক কর্তৃক নিজ কার্যালয়ে গড়ে তোলা ‘টর্চার সেলে’ অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিশেষ সহকারী রাশেদ খাঁন।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুচ এবং রাশেদ খাঁন এসব তথ্য তুলে ধরেন।

‘অফিসকেই টর্চার সেল বানিয়েছিলেন ইশতিয়াক’

গত বছরের ৭ মে এডিসি ইশতিয়াকের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন রাশেদ খাঁন। সেই অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি জানতেই বুধবার তিনি চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন।

পরে  রাশেদ খাঁন বলেন, "২০১৮ সালের ১ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমি অ্যারেস্ট হয়েছিলাম। ওই সময় ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তির একটি মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যে মামলার কথা আমি জানতামই না। ১ জুলাই আমাকে ভাসানটেক থেকে গ্রেপ্তার করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে এবং সেখান থেকে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটে নেওয়া হয়।"

সাইবার ক্রাইম ইউনিটে এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের  নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, "সেখানে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার হাত, চোখ এবং কথা যেন বলতে না পারি তাই মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ভেতর আমাকে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে নির্যাতন করা হয়। নিজের অফিসকেই সে টর্চার সেল বানিয়েছিল এবং সবার উপস্থিতিতেই এই নির্যাতন চালাত।"

নিজের সঙ্গে থাকা মোস্তাফিজ নামের এক যুবদল নেতার কথাও উল্লেখ করেন রাশেদ। তিনি জানান, ওই যুবদল নেতাকেও এডিসি ইশতিয়াক গুম করেছিলেন এবং পরে নির্যাতন চালিয়েছিলেন।

রাশেদ খান অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ড্রোনের মাধ্যমে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজগুলো মুছে ফেলেছিলেন এডিসি ইশতিয়াক। কাদেরকে কীভাবে গুলি করা হয়েছে বা হত্যা করা হয়েছে, তার প্রমাণ যেন না থাকে, সেজন্যই তিনি ওই ফুটেজগুলো ডিলিট করে দেন।

বিচারপতি জমাদারের ছেলে এডিসি ইশতিয়াক

রাশেদ খান বলেন, "শেখ হাসিনাকে কটূক্তির মামলায় আমাকে ১৫ দিন রিমান্ডে রেখে যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং জেলে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশ ছাড়া ডিএমপির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতর এডিসি ইশতিয়াক এই কাজ করতে পারে না।"

এডিসি ইশতিয়াকের পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, "আপনারা জানেন, তিনি বিতর্কিত বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদারের সন্তান। এই আবু আহমেদ জমাদার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের কথিত দুর্নীতির মামলায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা পরিচালনা করেছিলেন এবং বিতর্কিত কথাবার্তা বলেছিলেন। শেখ হাসিনার অত্যন্ত কাছের ব্যক্তি হওয়ায় শেখ হাসিনা তাকে এই ট্রাইব্যুনালেরই বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।"

এই ঘটনায় থানায় কোনো মামলা না করে সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের পরামর্শে ট্রাইব্যুনালেই সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন বলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানান রাশেদ।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া যোদ্ধারা ট্রাইব্যুনাল থেকে ন্যায়বিচার পাবেন।

মাওলানা আল-আমিনকে গুম ও হত্যা: ইশতিয়াকের বিরুদ্ধে চার্জ দাখিল

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল  ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে যারা মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন, তাদের তুলে নিয়ে একইভাবে অত্যাচার চালিয়েছিলেন এডিসি ইশতিয়াক ও তার দলবল। এরকম আরও অনেক অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে।

নতুন একটি বড় অভিযোগের কথা উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "এডিসি ইশতিয়াক সাহেবের বিরুদ্ধে আরও একটি ভয়াবহ অভিযোগ আছে। মাওলানা আল-আমিন (আবুল হোসেন) নামে এক ব্যক্তিকে তিনি তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে অপহরণ করার পর দীর্ঘদিন তাদের কাস্টডিতে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে তাকে হত্যা করে গুম করা হয়।"

তিনি আরও বলেন, "আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সেই মামলাটি তদন্ত করে আমার কাছে রিপোর্ট দিয়েছে। সেই রিপোর্টের সাপেক্ষে আজকেই (বুধবার) আমরা এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের বিরুদ্ধে মাওলানা আল-আমিনের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল করেছি।"

‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত অপরাধ’

এডিসি ইশতিয়াকের কর্মকাণ্ডগুলো 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তৎকালীন সময়ে বিতর্কিত কর্মকর্তারা ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে একটি গোষ্ঠীকে দমনের জন্য যে কাজগুলো করেছেন, সেগুলোই মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রত্যেকটি ঘটনার প্যাটার্ন ও পদ্ধতি একই। এটি অবশ্যই ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক অফেন্স’ (ব্যাপক ও পদ্ধতিগত অপরাধ)।"

রাশেদ খাঁনের করা অভিযোগটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমরা তদন্ত করে দেখছি এবং ইতোমধ্যে রাশেদ খানের বক্তব্য আমরা গ্রহণ করেছি। তাকে যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে, সেগুলো আসলে পাবলিকলি বলার মতো নয়। কেবল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে যেভাবে ভিন্নমতকে দমন করা হয়েছে, এটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত অপরাধ।"

এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম যুক্ত হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম  বলেন, "তদন্তে যদি তার সংশ্লিষ্টতা (কানেকশন) পাওয়া যায়, তবে থাকতে পারে।"

আরএনবি/এআর