নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
এছাড়া যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশেও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মামলা অন্য তিন আসামিরও একই দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্যরা হলেন- যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামির সবাই পলাতক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর প্রায় ১০ মাস পর দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে মামলার রায় হলো।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হলো আজ।
দুটি ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জনই পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।
বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
বাহাউদ্দিন নাছিমের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই আন্দোলন রুখে দিতে ও আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে দেন।
বাহাউদ্দিন নাছিম সেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন, যাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাহাউদ্দিন নাছিমের নির্বাচনী এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালায়।
বাহাউদ্দিন নাছিমের সেই প্ররোচনার পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
শেখ হাসিনা মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশ দেন। ওবায়দুল কাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর (দেখামাত্রই গুলি) নির্দেশ দেন। সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাহাউদ্দিন নাছিম অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।
নিজ জেলা মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারক করতেন বাহাউদ্দিন নাছিম। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদকে হত্যা এবং অসংখ্য আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডাররা।
৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন রুখে দিতে দলীয় নেতা–কর্মীদের যে নির্দেশ দেন, সেখানে বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনের সমর্থন ও প্ররোচনা দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী, ধর্ম ব্যবসায়ী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অশুভ শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বাহাউদ্দিন নাছিম। এমন প্ররোচনার পর ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আসামির নির্বাচনী এলাকার বাংলামোটরে আবদুল গনি, বেলাল হোসেন ও নয়ন মিয়াকে হত্যা এবং পল্টন নাইটিঙ্গেল মোড়ে ওবায়দুল হককে হত্যা করে। পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাকিব হোসেন, গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে রমজান মিয়া, বাংলামোটর এলাকায় ইসমাঈল হোসেন, চাঁনখারপুল এলাকায় ইসমামুল হকসহ মোট ১৩ জনকে হত্যা করে।
একইভাবে সারা দেশে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়।
আরাফাতের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তার বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই মন্তব্যসহ নানা উসকানি ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দেন তিনি।
পরদিন ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ সম্বোধন করে উসকানিমূলক যে বক্তব্য দেন, সেখানে আরাফাত উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনের সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে আরাফাত বিভিন্ন রকম উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। পরিকল্পিতভাবে হামলার নির্দেশ দেন তিনি। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ।
১৯ জুলাই আরাফাত প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী তকমা দেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টানা ৫ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহার করার মতো মজুতের বিষয় উল্লেখ করে হুমকি দেন।
আরাফাতের নির্বাচনী এলাকা মহাখালী রেলক্রসিং, চৌরাস্তাসহ আশপাশ এলাকায় ১৯ জুলাই হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আরাফাত।
ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ২০ জুলাই ফোন আলাপ করেন আরাফাত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন ও আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আরাফাত বলেন, ‘ওই যে অফ করে দিছি গতকাল দুই–একটাকে (টেলিভিশন)। আজকেও বলে রাখছি, যেগুলা শুনবে না, অফ করে দিতে বলব সাথে সাথে।’
আন্দোলন দমনে সরকারের অবৈধ বল প্রয়োগ ও বিভিন্ন সহিংসতার সংবাদ প্রচার করায় ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টার সংবাদ বুলেটিন চলার সময় বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভি এবং ২২ জুলাই বেলা দুইটায় সংবাদ চলার সময় বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪–এর সম্প্রচার ৩০ মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেন আরাফাত।
৪ আগস্ট আন্দোলন গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নিলে আরাফাত সংসদ ভবন এলাকায় পতিত সরকারের মুখপাত্র হিসেবে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। আন্দোলনকে সহিংস কর্মকাণ্ড দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনের নেতা–কর্মী ও অনুসারীদের আন্দোলন দমনের জন্য নির্দেশ দেন তিনি।
সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করা হয়।
শেখ পরশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা আছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলার সময় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশে আন্দোলন নস্যাতের জন্য পরশ তাঁর নিয়ন্ত্রিত আওয়ামী যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
পরশের নির্দেশ অনুসরণ করে যুবলীগ নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও গুরুতর আহত করে।
এ আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪–দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর আক্রমণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হয়। এই হত্যা, নির্যাতনের অন্যতম নির্দেশদাতা ও নেতৃত্বে ছিলেন পরশ।
১৮ জুলাই যুবলীগ ক্যাডাররা চট্টগ্রাম মহানগরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে তানভীর ছিদ্দিকী, সায়মন মাহিন, হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে হত্যা করে।
১৯ জুলাই যুবলীগ ক্যাডাররা মহাখালী এলাকায় শাহাজাহান, গণি মিয়া, আল আমিন রনি, জাহিদ হোসেন, ইমাম মেহেদী হাসান, মামুন হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ১ আগস্ট পরশ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা বলে আখ্যায়িত করেন। পরশ বলেন, ‘আজকে অবশেষে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার একটি নির্বাহী ঘোষণা আসতে পারে। এ ঘোষণা আসার পর ওরা আবারও মরণ কামড় দিতে পারে। আপনাদের এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার জামায়াতে ইসলামীর মতো সুশৃঙ্খল দলকে ১৪–দলীয় বৈঠকের পূর্বেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ষড়যন্ত্রের শামিল বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে আরও বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট পরশের অধীন যুবলীগ ক্যাডাররা লক্ষ্মীপুর শহরে নির্বিচারে গুলি করে সাদ-আল আফনান, ওসমান পাটোয়ারী, সাব্বির হোসেন ও কাওসারকে হত্যা করে। ৫ আগস্ট যুবলীগের নেতা-কর্মীরা রাজশাহী মহানগরে আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নামের দুজনকে হত্যা করে।
আরএনবি/এমআর