নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম
ভুয়া পরোয়ানার (ওয়ারেন্ট) মাধ্যমে গ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধে পুলিশ কর্মকর্তাদের কেন্দ্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (সেন্ট্রাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) থেকে ওয়ারেন্টের সত্যতা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম ও বিচারপতি মুরাদ-এ-মাওলা সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।
একইসঙ্গে এ বিষয়ে পরিপত্র (সার্কুলার) জারি করে দেশের সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠাতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) দায়ের করা এক রিট আবেদনের রুল শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ সিদ্ধান্ত জানায়।
রায়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের প্রতিও একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের সব অধস্তন আদালতের বিচারক (জেলা জজ, মহানগর জজ, সিজিএম, সিএমএম) বরাবর একটি নির্দেশনা পাঠাতে হবে। যাতে কোনো নালিশি মামলা (সিআর মামলা) দায়েরের সময় বাদী ও আইনজীবীর পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য আইনজীবীর প্রফেশনাল কার্ড এবং বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কপি মামলার সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘যেকোনো নাগরিককে গ্রেফতার করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুসরণ করতে হবে, অন্যথায় আইনের ব্যত্যয় ঘটবে। ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে গ্রেপ্তার হলে একজন নাগরিকের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়। এটি রোধ করা সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।’
আদালত আরও বলেছে, আদালতের মাধ্যমে মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সে কারণে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন অত্যন্ত প্রয়োজন। নতুবা নাগরিকের যে ক্ষতি হয়, তা পূরণ করা সম্ভব হয় না।
আদালতে রিটকারী পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মো. ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী, সঞ্জয় মণ্ডল ও নাসরিন সুলতানা।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জে আর খান রবিন এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. হুমায়ুন হোসেন তুহিন।
শুনানিতে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘২০১২ সালে আরিফ নিয়াজী নামের এক নাগরিককে তার গুলশানের বাসা থেকে ভুয়া পরোয়ানার মাধ্যমে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে সোপর্দ করার পর তিনি জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ও ওয়ারেন্ট দুটোই ভুয়া। যে আদালতে তাকে উপস্থাপন করা হয়, ওই আদালতের নির্দেশে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও ভুয়া মামলার বিষয়টি প্রমাণিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে শত্রুতা হাসিলের জন্য প্রভাবশালীরা নাগরিকদের কীভাবে হয়রানি করছেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আইন অনুযায়ী কোনো কারণ ছাড়া ভুয়া ওয়ারেন্টের কারণে মানুষ ব্যাপক হয়রানির শিকার হচ্ছে।’
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন যুক্ত করে ভুয়া ওয়ারেন্ট ও নালিশি মামলা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে রিট করেছিল এইচআরপিবি। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হাই কোর্ট রুল জারির পাশাপাশি আরিফ নিয়াজীকে গ্রেফতারের বিষয়ে গুলশান থানার ওসিকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সোমবার সেই রুল নিষ্পত্তি করেই রায় দিল আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জে আর খান রবিন রুলের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সেন্ট্রাল ডেটা সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যার কারণে ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে গ্রেফতারের কোনো সুযোগ নেই।’
এছাড়া এই মামলাটি যেহেতু ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ নিজে করেনি, সুতরাং তার প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।
এইচআরপিবির করা এই রিট পিটিশনে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, র্যাবের ডিজি, চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও গুলশান থানার ওসিসহ মোট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছিল।
আরএনবি/এমআই