রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটটি খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট।
রিটটি আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ দায়ের করেননি এবং এর পেছনে ‘প্রতারণার’ উদ্দেশ্য থাকতে পারে— খোদ আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের এমন আপত্তির প্রেক্ষিতেই আদালত রিটটি ‘উত্থাপিত হয়নি’ (নট প্রেসড) মর্মে খারিজ করে দেয়।
রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমি। অন্যদিকে আওয়ামীপন্থি আইনজীবী হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নূরুন্নবী বুলবুল। এদিন আদালতে শতাধিক আওয়ামীপন্থি আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা মো. আল আমিনের পক্ষে রিট আবেদনটি দায়ের করেছিলেন আইনজীবী ইউনূস আলী।
রিটে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনটি কেন ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’ ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুল চাওয়ার পাশাপাশি প্রজ্ঞাপনটির কার্যকারিতা স্থগিতের আরজি জানানো হয়েছিল।
যে কারণে রিটের বিরোধিতা করলেন আওয়ামীপন্হী আইনজীবীরা
আওয়ামী লীগের পক্ষে দায়ের করা রিট কেন আওয়ামীপন্হী আইনজীবীরাই খারিজ চাইলেন— এ নিয়ে আদালতে এবং আদালতের বাইরে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, দলগত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই এবং আইনি বৈধতা (লুকাস স্ট্যান্ডি) নেই— এমন এক ব্যক্তির রিট করার পেছনে তারা অসৎ উদ্দেশ্য দেখছেন। এছাড়া বিষয়টি আইনিভাবে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে রাজপথে মোকাবিলার নীতিগত অবস্থানে রয়েছে দলটি।
জানা যায়, জেলে থাকা নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিতে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের অনুমতিতেই গঠন করা হয়েছে ‘আইন সহায়ক পরিষদ’। এই পরিষদের সদস্যসচিব হিসেবে আছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নূরুন্নবী বুলবুল।
শুনানির বিষয়ে নূরুন্নবী বুলবুল বলেন, ‘যিনি রিট পিটিশনটি দাখিল করেছেন, তিনি ভুল পরামর্শের শিকার হয়েছিলেন। আদালতের কাছে আমাদের সাবমিশন ছিল— এই মামলা দায়েরের এখতিয়ার বা 'লোকাস স্ট্যান্ডি' ওই ব্যক্তির নেই। কারণ তিনি আওয়ামী লীগের কোনো নেতা, কর্মী বা কোনো পর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তিনি দলটিকে প্রতিনিধিত্ব করার কোনো অধিকার রাখেন না।’
তিনি আরও জানান, রিটকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ ইউনুস আলীও আদালতে উপস্থিত থেকে স্বীকার করেছেন যে, রিটকারী সঠিক পরামর্শ পাননি। এরপর উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত রিটটি 'নট ইন ফর্ম' ও 'নট প্রেসড' হিসেবে খারিজ করে দেন।
আওয়ামীপন্হী আরেক আইনজীবী সুবির নন্দি দাস বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সেন্ট্রাল কমিটি বা দলীয় সভাপতি রয়েছেন। দলের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত ছাড়া, হাজার হাজার আইনজীবী থাকতে বাইরের একজন ব্যক্তি কেন মামলা করবেন? আমরা বিষয়টি পজিটিভলি দেখিনি।’
সন্দেহ পোষণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে, নিষিদ্ধকরণের কার্যক্রমকে আদালতের মাধ্যমে বৈধতা পাইয়ে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যেই যেনতেনভাবে মামলাটি ফাইল করা হয়েছিল। এটার মধ্যে বহু প্রতারণা রয়েছে। রিটকারীর আইনজীবীও পরে আমাদের বক্তব্যের সাথে একমত হয়েছেন।’
এই আদেশের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো রিট করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সুবির নন্দি দাস বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সরকার নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করেছে। এটি একটি রাজনৈতিক ব্যাপার। আওয়ামী লীগ এটি রাজনৈতিকভাবে রাজপথে মোকাবিলা করবে। আমরা এটি নিয়ে এখনই কোর্টে যেতে চাই না। এমন কোনো চিন্তাও আপাতত নেই।’
একই মত আরেক আইনজীবী তৌহিদ তিতাসেরও। তিনি বলেন, ‘এই রিট করার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এবং যে ব্যক্তি রিটটি করেছেন তিনি রিট করার সঠিক ব্যক্তি নন। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ যেন আর কোনো রিট ফাইল না করতে পারে- সেই দুরভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতেই বেনামি ব্যক্তিকে পিটিশনার বানিয়ে করা হয়েছে।’
তৌহিদ তিতাস মনে করেন, এটি আওয়ামী লীগকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করার একটি ‘বিচারিক ষড়যন্ত্র’। তার মতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের নির্বাহী আদেশ দল হিসেবে রাজপথে লড়াই করেই প্রত্যাহার করবে তারা।
তবে 'রিটটি দায়ের করার জন্য রিটকারী উপযুক্ত ব্যক্তি নয়' রিট প্রত্যাহারে এই দাবি ছাড়া অন্য কিছু দেখাতে পারেননি তারা। এটিই রিট প্রত্যাহারে তাদের প্রধান আর্গুমেন্ট ছিলো বলে জানান আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
শুনানির বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমি বলেন, "আমাদের বক্তব্য ছিল, উনারা যদি রিটটি চালাতে চান, তবে আমরা আমাদের সাবমিশন রাখব, যার জন্য সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু রিটকারীর পক্ষ থেকেই যখন বলা হলো যে আবেদনটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় (প্রপার ম্যানারে) ফাইল করা হয়নি এবং তারা এটি চালাবেন না, তখন আদালত স্বাভাবিকভাবেই সেটি 'উত্থাপিত হয়নি' মর্মে খারিজ করে দিয়েছেন।"
প্রজ্ঞাপনে যা ছিল
এর আগে গত ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ ও সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
আরএনবি/এমআই