নিজস্ব প্রতিবেদক
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে প্রকৃত খুনিদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের একদল আইনজীবী।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় তারা এ অভিযোগ করেন। আইনজীবীরা এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) স্থানান্তরের দাবিও জানান।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সামনে রংপুরে প্রবীণ শিক্ষকসহ একই পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং বিচারের দাবিতে এবং দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদ।
সভায় আইনজীবী কাজল প্রসাদ দে বলেন, এখানে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সকালে উঠে তারা দুই ছেলেকে ইয়াবাসেবী বানিয়ে দিল। তাদের নিয়ে বলল, তারা আমাদের কাছে স্বীকার করেছে যে তারাই হত্যা করেছে। তখন আমরা কেন, সারা জাতিই সন্দেহ করল যে তারা এখানে সাম্প্রদায়িক রং লাগানোর চেষ্টা করছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মারা গেছে হিন্দু, আসামি ধরল হিন্দু, পুলিশ, ডিসি, ডিবি হলো হিন্দু, ডাক্তার হলো হিন্দু। মানে হিন্দুকে হিন্দু দিয়ে এখানে আর মাঝখান দিয়ে কলকাঠি নিয়ে আসলো আব্দুর মাবুদ, ডিআইজি, রংপুর কমিশনার আব্দুর মাহবুব। এই আব্দুর মাবুদ কোনো ঘটনার নায়ক কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
দুই কিশোরের ডোপ টেস্ট নেগেটিভ আসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ডোপ টেস্ট নেগেটিভ আসার পর পরিষ্কার হয়ে গেল যে আব্দুর মাহবুব ও সনাতন বাবুকে রিমান্ডে না নেওয়া পর্যন্ত রহস্য উন্মোচন হবে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, হয় সম্পত্তি-সংক্রান্ত, অথবা নারী ধর্ষণ-সংক্রান্ত, অথবা মাথাওয়ালা হিন্দুদের উচ্ছেদ করার জন্য এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
আইনজীবী সুলতান মাহমুদ বলেন, সংবিধানে সব ধর্মের সমঅধিকার নিশ্চিত থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকেই সংখ্যালঘুদের বিতাড়িত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। রংপুরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সেই প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা। ঘটনার পরপরই মূল ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই নাটক চালানো হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত দল রংপুর সফরের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, জজ মিয়া নাটকের অবসান হতে হবে। আমাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মানবাধিকার ফোরামগুলোতে এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে হবে।
সনাতনীদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্ত্তী বলেন, আমরা সনাতনীরা সবসময় অবহেলিত হয়ে আসছি। সরকারের কাছে আমাদের আকুল প্রার্থনা—আপনারা আমাদের নিরাপত্তা দিন। বর্তমানে কোনো মানুষেরই জীবনের নিরাপত্তা নেই। আমরা ১৯৭১ সালে এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছি, আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। এই দেশ আমাদের।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, আমরা বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। কেন আপনারা নাটক সাজাচ্ছেন? পুলিশ প্রশাসনকে এভাবে ব্যবহার করবেন না। আপনাদের লোক দিয়ে নামমাত্র বিচার বিভাগীয় তদন্ত করলে হবে না। নিরপেক্ষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দিয়ে তদন্ত করাতে হবে, যেন সারা বিশ্ব তা বিশ্বাস করে।
সমাপনী বক্তব্যে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী কঠোর ভাষায় প্রশাসনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আমরা বলি যে জন্মই আমাদের আজন্ম পাপ, সেই পাপ আমরা যুগে যুগে বহন করে চলেছি। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বহু হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগে হুমকি ছিল ভোটের আর জায়গাজমির। এখন দেখা দিয়েছে প্রাণের হুমকি। আগে ছিল বিতাড়িত করা, আর এখন শুরু হয়েছে নিধন। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেননি। আপনারা ক্ষমতা ভোগের প্রতিযোগিতা করছেন, কিন্তু জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারছেন না।
রংপুরের ঘটনাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে সুব্রত চৌধুরী বলেন, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার মাধ্যমে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাংবিধানিক শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না। পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
তিনি দাবি জানান, এই হত্যাকাণ্ড অচিরেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) স্থানান্তর করতে হবে এবং সেখানেই এর নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় আমরা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হব।
আইনজীবীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রকৃত খুনিদের আড়াল করার চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না এবং তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।
আরএনবি/এআর