Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

শেখ হাসিনা ও জিয়াউল আহসানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি

৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকে ২০১৫ সালে গুম করে ভারতে পাচার করার ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

সালাউদ্দিন আহমদকে অপহরণ করে ৬১ দিন গোপন সেলে বন্দি রাখা এবং পরবর্তীতে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ফেলে আসার ঘটনাটিকে ‘মেটিকুলাস প্ল্যান’ বা অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনা হিসেবে অভিহিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অন্য মামলার পাশাপাশি এই মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেফতার আছেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। গুমের এই ঘটনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ একাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। তবে তদন্ত চলমান থাকায় সবার নাম প্রকাশ করতে অপারগতা জানান তারা।

এর আগে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। এরপর বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী সালাহউদ্দিন আহমদকে গ্রেফতার দেখায় সেখানকার পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের মামলা এবং ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়।

গুম হয়ে ভারতে উদ্ধার হওয়া সালাউদ্দিন আহমদের আইনি লড়াই ও খালাস প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রথমে তাকে ৬১ দিন বাংলাদেশে— টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এরপরে তাকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে রেখে আসা হয়। পুলিশ তাকে প্রথমে ট্রমাটাইজ দেখে হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে তিনি পুলিশকে বলেন যে, তিনি এখানে কীভাবে আসছেন জানেন না, তবে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল বাংলাদেশে। এরপর থেকে তাকে বিভিন্ন গোপন সেলে বন্দি রাখা হয়েছিল।

ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত তাকে খালাস দেন। এর বিরুদ্ধে ভারত সরকার আপিল করে। তবে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শিলং জজ আদালত সালাহউদ্দিন আহমদকে খালাস দেন।

এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ইন্ডিয়ান পুলিশ তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় মামলা দেয়। মজার ব্যাপার হলো যে, পুলিশের দায়েরকৃত যে মামলা, অর্থাৎ প্রসিকিউশন কেইসেও এই জিনিসটা প্রমাণিত হয় এবং আসামি পক্ষের সাফাই সাক্ষী মানলেও প্রমাণিত হয়। ইন্ডিয়ান কোর্ট নিশ্চিত হন যে তিনি অপহৃত হয়েছিলেন এবং তাকে মেঘালয়ের শিলংয়ে ফেলে রাখা আসা হয়। এই অবজারভেশন দিয়েই তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আপিল কোর্টও সেই আদেশ বহাল রেখেছেন।

এই গুমের ঘটনায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ভূমিকা নিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল। না হলে একটা দেশের বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হওয়া, বিএনপির একজন সিনিয়ির নেতা, তাকে অপহরণ করে নিয়ে টিএফআই-এর সেলে বন্দি করে রাখা দীর্ঘদিন এবং সেখান থেকে অন্য দেশে নিয়ে পাচার করা— সেটা যদি অন্য দেশের সঙ্গে এই দেশের সরকারের কোনো গোপন প্যাক্ট না থাকত, তাহলে কী করে বর্ডার ক্রস করে আরেক দেশে নিয়ে রেখে আসতে পারে?

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তৎকালীন সরকারপ্রধানসহ, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা তৎকালীন র‍্যাবের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যারা অপহরণ করেছে, তাদের মেটিকুলাস প্ল্যান অনুযায়ী এমন হয়েছে। তাই অবশ্যই তারা এই মামলায় আসামি হবে।

প্রসিকিউটর উদয় রহমান তদন্তের অগ্রগতি জানিয়ে বলেন, সালাউদ্দিন সাহেবের মামলা নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। আমাদের টার্গেট তিন মাসের মধ্যেই ফর্মাল চার্জ সম্পন্ন করা। জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বেই (কো-অর্ডিনেশন) এই কাজ হয়েছে। এক্ষেত্রে আসামি আরও বাড়বে। একটাই শুধু মিসিং লিঙ্ক, এটা হলো এ কে আজাদ । র‍্যাবের মধ্যে সে ‘জঙ্গি আজাদ’ নামে পরিচিত ছিল। সে মারা গেছে, এটা একটা মিসিং লিঙ্ক।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অ্যানালাইসিস হচ্ছে যে, এই কাজ তো আসলে জিয়া একা করার কথা না। মূলত ইলিয়াস আলীকে যেরকম গুম করা হয়েছে, এরকম ঘটনাই মূলত এখানেও ঘটতো হয়তো। সেই হিসেবে এখানে শেখ হাসিনা, তারেক সিদ্দিকী জড়িত থাকা উচিত।

এদিকে নিজের গুম হওয়ার ভয়াবহ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাকে একটি ছোট কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। কক্ষটি ছিল ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের মতো। মেঝেতে একটি কম্বল বিছানো ছিল, সেটিই ছিল শোবার জায়গা। সেখান থেকে দুর্গন্ধ আসত। পানি দেওয়া হতো, কিন্তু আমি অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সুযোগ ছিল ছিল না। চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হতো।

ভারতে ফেলে আসার মুহূর্ত স্মরণ করে তিনি বলেন, আমাকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। তখন সূর্য ওঠার সময়। আমি পাশের একটি বিলবোর্ড দেখে বুঝতে পারি, আমি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে আছি। পুলিশ আমাকে মানসিক ভারসাম্যহীন ভেবেছিল। একসময় মনে হয়েছিল, বিদেশের মাটিতে হয়তো পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের সঙ্গেও জিয়াউল আহসানসহ কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ইমরুল কায়েস নামে একজন সাক্ষী জিয়াউল আহসানের মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তার কাছ থেকে ইলিয়াস আলীর গুম সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। এই দুটি মামলা আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিনি আরও যোগ করেন, ২৫০ গুম পরিবারের মামলা নিয়েও ইনভেস্টিগেশন চলছে। আগামী ৬ তারিখে ভিক্টিম পরিবারের সবাইকে প্রসিকিউশন কার্যালয়ে ডাকা হয়েছে। যেগুলো ব্যাপক মাত্রায়  বা সিস্টেমেটিক হয়েছে, সেগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। আমরা ব্যরিস্টার আরমান এবং ব্রিগেডিয়ার আজমীর ট্রায়ালও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি।

মামলায় গ্রেফতার সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। 

তবে তদন্তকারীরা বলছেন, সালাহউদ্দিন আহমদ টিএফআই সেলে অবস্থান করার সময় সেলের নিরাপত্তারক্ষী সেখানে থাকা অন্য ভুক্তভোগীদের জানিয়েছিলেন, ‘তোমাদের দলের একজন হাই-প্রোফাইল নেতাকেও এখানে আনা হয়েছে।’ ওই সময় টিএফআই সেলে আটক থাকা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং গুমের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দেওয়া কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্ত সংস্থার।

জানা যায়, সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় তৎকালীন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার কার্যক্রমসহ টিএফআই-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে টিএফআইয়ের দায়িত্বে থাকা বর্তমানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্ত সংস্থার হেফাজতে আনা হয়েছিল। তদন্তে আরেক কর্মকর্তা টিএফআইয়ের ওয়াইসি (অফিসার ইনচার্জ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক এ কে আজাদের ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তবে পরবর্তীতে সিলেটের জৈন্তাপুরে একটি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বোমা হামলায় তিনি নিহত হন। ফলে তার কাছ থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তদন্তে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা এ কে আজাদের মৃত্যুকে তদন্তের একটি ‘মিসিং লিংক’ হিসেবে দেখছেন।

এদিকে এই মামলায় গত ২৭ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিএনপি নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে গ্রেফতার দেখিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

একইসঙ্গে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৭ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে।

এর আগে  সালাহউদ্দিন আহমদ গত বছরের ৩ জুন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযুক্ত অন্য পাঁচজন হলেন— সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামসহ অজ্ঞাতনামা অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয় বলে তখন অভিযোগ করেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ।

অন্যদিকে তখন বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সালাহউদ্দিন আহমদকে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। ওই সময় সালাহউদ্দিন বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

একই বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্ধার করে। ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সালাহউদ্দিন আহমদ শিলংয়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় লোকজনের ফোন পেয়ে তাকে আটক করা হয়।

জুলাই আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট সালাহউদ্দিন আহমদকে দেশে ফেরার জন্য ভ্রমণ অনুমোদন বা ট্রাভেল পাস দেয় ভারত। ওই বছরের ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে তৎকালীন  প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন। এরপর প্রশাসনের চাকরি ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে আসেন। ২০০১ সালে তিনি কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির মহাসচিবসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সময় সালাহউদ্দিন আত্মগোপনে থেকে দলের মুখপাত্র হিসেবে বিবৃতি দিতেন, গণমাধ্যমে কথা বলতেন। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন।

আরএনবি/এফএ